চট্টগ্রাম — জেলা প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসের বিষক্রিয়ায় নয়জন শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। তবে দুর্ঘটনার মূল কারণ উদঘাটন, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি যাচাই এবং দায়ীদের শনাক্ত করতে জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসবিআর) এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিহত শ্রমিকদের প্রত্যেকের পরিবারকে বিএসবিআরের পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলমগীর সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন যে, দুর্ঘটনার পর এখন পর্যন্ত থানায় কোনো নিয়মিত মামলা রেকর্ড করা হয়নি। একই বিষয়ে সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। নিহতদের পরিবার বা সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক এজাহার দায়ের হলে অথবা পুলিশের প্রাথমিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে দ্রুতই মামলা দায়ের করা হবে।
এদিকে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নয় সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া স্বাক্ষরিত আদেশে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহাবুবুল হককে এই কমিটির আহ্বায়ক এবং সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুনকে সদস্যসচিব করা হয়েছে।
কমিটিতে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা পুলিশ সুপার, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসবিআর), পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির সদস্য ও সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণের উৎস ও কারণ খতিয়ে দেখার পাশাপাশি ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের পেশাগত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও ব্যক্তিগত কোনো অবহেলা বা দায় রয়েছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কমিটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট নীতিগত সুপারিশ প্রণয়ন করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসবিআর)-এর পক্ষ থেকেও পৃথকভাবে পাঁচ সদস্যের একটি কারিগরি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিএসবিআর সভাপতি মো. মহসিন চৌধুরীর স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক স্মারকের মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়। বিএসবিআরের টেকনিক্যাল উপদেষ্টা ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরীকে আহ্বায়ক এবং নাজমুল ইসলামকে সদস্যসচিব করে গঠিত এই কমিটিতে কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে বিএসবিআরের উপদেষ্টা নাঈম শাহ ইমরান, টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট ক্যাপ্টেন সিরাজুল মাওলা এবং এইচআর শিপ ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মাহাবুবুর রহমানকে।
একই সাথে দুর্ঘটনার সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা ও আইনি মানদণ্ড যাচাইয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও একটি তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। শনিবার সকালে ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর নাসের। এ সময় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া এবং বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শন শেষে কর্মকর্তারা বিএসবিআর সভাপতি মো. মহসিন চৌধুরীর সঙ্গে ইয়ার্ডের নিরাপত্তা প্রটোকল ও দুর্ঘটনার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বিএসবিআর সভাপতি জানান, তাঁদের কারিগরি তদন্ত কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরেজমিন তথ্য সংগ্রহ করে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে বিভিন্ন সময় স্ক্র্যাপ জাহাজের প্রকোষ্ঠে জমে থাকা মিথেন, কার্বন মনোক্সাইড বা অন্যান্য ক্ষতিকারক গ্যাসের কারণে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটে থাকে। প্রচলিত শ্রম ও শিল্প নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী জাহাজে কাজ শুরুর পূর্বে গ্যাস-মুক্তকরণ সনদ গ্রহণ এবং উপযুক্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। এই দুর্ঘটনার পেছনে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা ছাড়পত্রের কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা নিয়ে তদন্ত কমিটিগুলোর প্রতিবেদন এবং পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের দিকে এখন সংশ্লিষ্ট মহলের নজর রয়েছে।