প্রযুক্তি প্রতিবেদক
ডিজিটাল যুগে কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে আয়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব তাদের মনিটাইজেশন বা আয় বণ্টনের শর্তাবলীতে নতুন করে পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। প্ল্যাটফর্মটিতে কনটেন্ট নির্মাতাদের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখা এবং প্ল্যাটফর্মের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। নতুন এই নীতিমালা আগামী বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।
ঘোষিত নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ইউটিউব পার্টনার প্রোগ্রামে (ওয়াইপিপি) নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হতে চাওয়া নির্মাতাদের জন্য আগের তুলনায় কঠিন শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন নিয়মে কোনো ক্রিয়েটরকে মনিটাইজেশন সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হতে হলে গত এক বছরে কমপক্ষে ৮ হাজার ঘণ্টা ওয়াচ টাইম অথবা গত ৯০ দিনে ২ কোটি যোগ্য ‘শর্টস ভিউ’ অর্জন করতে হবে। বর্তমান নিয়মে এই শর্তটি ছিল গত এক বছরে ৪ হাজার ঘণ্টা ওয়াচ টাইম অথবা ৯০ দিনে ১ কোটি শর্টস ভিউ। অর্থাৎ, শর্টস নির্মাতাদের জন্য ভিউয়ের লক্ষ্যমাত্রা দ্বিগুণ করা হয়েছে। তবে ১ হাজার সাবস্ক্রাইবারের পূর্বশর্ত অপরিবর্তিত রয়েছে।
ইউটিউব কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে যে, এই নতুন নিয়মের প্রভাব মূলত নতুন নির্মাতাদের ওপর পড়বে। যারা ইতোমধ্যে ইউটিউব পার্টনার প্রোগ্রামে সফলভাবে যুক্ত হয়েছেন, তাদের ওপর এই পরিবর্তনের কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে বর্তমানে পার্টনার প্রোগ্রামে থাকা শর্টস নির্মাতাদের আয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেও সতর্ক থাকতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী, শর্টস থেকে আয় অব্যাহত রাখতে একজন নির্মাতাকে প্রতি ৯০ দিনে অন্তত ১ কোটি ভিউ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো চ্যানেলের ভিউ এই নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে গেলে সাময়িকভাবে তাদের ‘শর্টস ক্রিয়েটরস পুল’ থেকে আয় বন্ধ হয়ে যাবে। তবে চ্যানেলটি যদি পার্টনার প্রোগ্রামের শর্ত পূরণ করে থাকে, তবে তারা দীর্ঘ ভিডিও বা লং-ফর্ম কনটেন্ট থেকে পূর্বের ন্যায় আয় চালিয়ে যেতে পারবে। পরবর্তীতে পুনরায় ১ কোটি ভিউয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করলে শর্টস থেকে আয় পুনরায় চালু হওয়ার সুযোগ থাকবে।
প্ল্যাটফর্মটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিনিয়ত ইউটিউবের ব্যবহারকারীর সংখ্যা এবং ভিডিও দেখার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে ২০০ বিলিয়নের বেশি শর্টস ভিডিও দেখা হচ্ছে এবং টিভিতে প্রতিদিন ১০০ কোটির বেশি ঘণ্টা ইউটিউব ভিডিও প্রদর্শিত হচ্ছে। বিশাল এই কনটেন্ট ভাণ্ডার ও দর্শকদের চাহিদার কথা বিবেচনা করেই নিয়মনীতিতে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
পাশাপাশি, ইউটিউব তাদের ‘প্রিমিয়াম লাইট’ সাবস্ক্রিপশন সেবাটি আরও বেশ কিছু দেশে সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই প্রিমিয়াম সেবার গ্রাহকদের থেকে প্রাপ্ত সাবস্ক্রিপশন আয়ের একটি অংশ কনটেন্ট নির্মাতাদের মাঝে বণ্টন করা হবে। বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, দীর্ঘ ভিডিও বা লং-ফর্ম কনটেন্ট নির্মাতারা তাদের ভিডিওতে প্রদর্শিত বিজ্ঞাপনের আয়ের ৫৫ শতাংশ এবং শর্টস নির্মাতারা ৪৫ শতাংশ লভ্যাংশ পেয়ে থাকেন। নতুন নিয়মেও এই অনুপাত বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউটিউবের এই কঠোর নীতিমালা মূলত প্ল্যাটফর্মের কনটেন্টের গুণগত মান নিশ্চিত করার একটি কৌশল। এর ফলে মানহীন ভিডিওর পরিবর্তে সৃজনশীল এবং তথ্যবহুল কনটেন্ট নির্মাতাদের প্রাধান্য বাড়বে, যা সামগ্রিক ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনবে। তবে নতুন ও ক্ষুদ্র নির্মাতাদের জন্য আয়ের পথ কিছুটা সংকীর্ণ হতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে। সবমিলিয়ে, ইউটিউবের এই পরিবর্তন ডিজিটাল কনটেন্ট মার্কেটিং ও সৃজনশীল পেশার সাথে যুক্ত লাখ লাখ মানুষের আয়ের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।