বিশেষ প্রতিবেদক
ইতিহাসের সত্যতা নিশ্চিত করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, কোনো অসম্পূর্ণ, অতিরঞ্জিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান ইতিহাসকে শক্তিশালী করে না; বরং তা ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে এবং ভবিষ্যতে বিভেদের সৃষ্টি করে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস তুলে ধরা জরুরি।
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে নবনির্মিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধনকালে দেওয়া প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী চক্র কখনো দেশে গণতান্ত্রিক শাসনকে মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭৫ সালে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরবর্তীতে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহান স্বাধীনতার ঘোষক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসও যথাযথভাবে এই জাদুঘরে সংরক্ষিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকার প্রধান আশা প্রকাশ করেন, এই জাদুঘরে জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে শহীদদের জীবনকথা, আহতদের সাক্ষ্য, ছাত্র-জনতার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, সংবাদ প্রতিবেদন, পোস্টার, দেয়াল লিখন, গ্রাফিতি, কার্টুন, কবিতা, গান, নাটক, চিত্রকর্ম এবং ব্যক্তিগত স্মারক ডিজিটাল উপাদানে সংরক্ষিত থাকবে। জাদুঘরের উপাদানগুলো বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষায় উপস্থাপনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এতে বিশ্ববাসী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাবে। যাঁরা এই জাদুঘরের জন্য ব্যক্তিগত স্মারক ও শিল্পকর্ম প্রদান করেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী।
আন্দোলনে হতাহতদের বিচারের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, কোনো প্রতিহিংসামূলক বিচার নয়; বরং আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিচার সম্পন্ন করা হবে। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের সময়ে সংঘটিত প্রতিটি অপরাধের বিচার স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে অনুষ্ঠিত হবে। আইনের শাসন নিশ্চিত করতেই এই বিচার কার্য সম্পাদনে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
গণঅভ্যুত্থানের জনসম্পৃক্ততার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, এই আন্দোলন কোনো একক রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির নয়। দেশের গণতন্ত্রকামী সাধারণ জনগণই এই অভ্যুত্থানের মূল নায়ক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ‘স্বাধীনতা অর্জনের’ এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে ‘স্বাধীনতা রক্ষার’ সংগ্রাম হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতি যেভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মনে রেখেছে, ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালের শহীদদের অবদানও চিরকাল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।
আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসাসেবা ও সরকারি সহায়তার চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, আহত ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক ও রাশিয়া সহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছে এবং বর্তমানে অন্তত ৫০ জন রোগী বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া গেজেটভুক্ত ১৩ হাজারের বেশি আহত সদস্যকে তাঁদের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে শ্রেণিভিত্তিক মাসিক সম্মানী ভাতা প্রদান শুরু হয়েছে।
দেশ পুনর্গঠনে সরকারের রূপরেখা বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই কাজ শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে দলের ৩১ দফা ইশতেহার এবং জাতীয় সংসদ চত্বরে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদের’ পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন চলছে। পাশাপাশি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে জাতীয় সংসদে গঠিত ‘সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি’ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশে কোনো কোনো মহল অহেতুক নতুন ইস্যু তৈরি করে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা অজান্তেই পরাজিত ও পলাতক স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের পথ সুগম করছে কি না, তা গভীরভাবে ভেবে দেখার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।