আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক বৈষম্য এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বেঁচে যাওয়া নারীদের জন্য একটি সম্পূর্ণ স্বশাসিত ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে উঠেছে ‘জিনওয়ার’ নামের একটি ব্যতিক্রমী গ্রাম। কুর্দি ভাষায় যার অর্থ ‘নারীদের পরিসর’। সিরিয়ার কামিশলি শহরের উপকণ্ঠে মরুভূমির বুকে অবস্থিত এই জনপদে প্রায় ৩০টি মাটির তৈরি বাড়ি রয়েছে, যেখানে শুধুমাত্র নারীরাই সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। পুরুষদের জন্য এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস বা রাত্রিযাপনের কোনো অনুমতি নেই। সাম্প্রতিক সময়ে ইতালীয় আলোকচিত্রী মাত্তেও ট্রেভিসানের ক্যামেরায় এই গ্রামের অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রা ও শাসনব্যবস্থার চিত্র উঠে আসার পর বিষয়টি বৈশ্বিক গণমাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কুর্দি, আরব ও ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের নারীরা একত্রিত হয়ে এই ধরনের নারী-নেতৃত্বাধীন স্বশাসিত কমিউন বা অঞ্চল গড়ে তুলেছেন। জিনওয়ার গ্রামের বাসিন্দাদের অধিকাংশই যুদ্ধে স্বামী হারানো, পারিবারিক নির্যাতনের শিকার কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার সন্ধানে আসা নারী। রাষ্ট্রীয় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই এই জনপদের বাসিন্দারা নিজস্ব অর্থায়নে এবং শ্রমে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কৃষিভিত্তিক সমবায়, বেকারি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় শাকসবজি, ফলমূলের চাষ এবং ক্ষুদ্র পশুপালনের মাধ্যমে তারা নিজেদের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করছেন।
এই জনপদে আশ্রয় নেওয়া বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ৫৫ বছর বয়সী কুর্দি নারী ওয়েলাত, যিনি স্বামীর সাথে বিচ্ছেদের পর চরম সংকটে পড়ে এক বছর আগে এখানে আশ্রয় নেন। বর্তমানে তিনি গ্রামের শিশুদের কুর্দি ভাষা শেখানোর পাশাপাশি গ্রামের প্রবেশপথে ওয়াকিটকি ও রাইফেল হাতে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। একইভাবে, ৫৭ বছর বয়সী নুজিন মিহেমেদ স্বামী মারা যাওয়ার পর পারিবারিক ও সামাজিক মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে জিনওয়ারে আসেন। বর্তমানে তিনি গ্রামের সমবায় বেকারিতে রুটি তৈরির কাজ করছেন। অন্যদিকে, আলেপ্পো থেকে আসা ২৮ বছর বয়সী জেসমিন জানান, দাম্পত্য বিচ্ছেদের পর তিনি ইউরোপে অভিবাসনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিন্তু জিনওয়ারের পরিবেশ ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির কথা জানতে পেরে তিনি এখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সিরিয়ার এই অঞ্চলে জিনওয়ারের পাশাপাশি নারী-পুরুষের যৌথ অংশগ্রহণে ‘জারুদি’ নামে আরেকটি পরিবেশবান্ধব স্বশাসিত কমিউনও কার্যকর রয়েছে। ২০১৩ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর স্থানীয় বাসিন্দারা একটি গণবাগান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এর কার্যক্রম শুরু করেন। বর্তমানে এই অঞ্চলের বাসিন্দারা কৃষি ও স্থানীয় সেবা কার্যক্রম নিজেদের মধ্যে ভাগ করে পরিচালনা করছেন।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে, জিনওয়ারসহ এই ধরনের স্বশাসিত কমিউনগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক বা আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। এগুলো মূলত উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার কুর্দি নেতৃত্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনের আওতায় সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। কোনো সরকারি বা আন্তর্জাতিক তহবিল ছাড়াই স্থানীয় ক্ষুদ্র উৎপাদন, বেকারি ও কৃষি সমবায়ের মাধ্যমে এই জনপদগুলো অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হয়ে উঠছে, যা যুদ্ধবিক্ষুব্ধ মধ্যপ্রাচ্যে নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সুরক্ষার একটি টেকসই ও বিকল্প মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।