আইন আদালত ডেস্ক
রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেননকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছেন আদালত। আজ বুধবার ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. শাহজাহান কবিরের আদালত এই আদেশ প্রদান করেন। শুনানির পর রাশেদ খান মেননকে পুনরায় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালত সূত্রে জানা যায়, বুধবার সকালে কড়া নিরাপত্তায় রাশেদ খান মেননকে কারাগার থেকে ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সাবেক এই মন্ত্রীকে গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য আদালতে আবেদন জানান। রাষ্ট্রপক্ষে মহানগর পিপি এবং দুদকের আইনজীবী আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনের বিরোধিতা করে জামিন প্রার্থনা করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিধি বহির্ভূতভাবে অনিয়ম ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে পূর্বপরিচিত ১৩ জন প্রার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগে গত বছরের ২২ ডিসেম্বর রাশেদ খান মেননসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করে দুদক। রাশেদ খান মেনন ওই সময় প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, জালিয়াতি এবং সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়।
দুদকের মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রচলিত বিধি অনুযায়ী বিশেষ গভর্নিং কমিটির কোনো নিয়োগ বোর্ড গঠনের আইনি ক্ষমতা ছিল না। তা সত্ত্বেও উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে একটি নিয়োগ বোর্ড গঠন করা হয়। যথাযথ নিয়ম না মেনে গঠিত ওই নিয়োগ বোর্ডে মাউশির মহাপরিচালক বা তার মনোনীত কোনো প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ের কোনো বিশেষজ্ঞ শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যা জনবল কাঠামো ও নিয়োগ নীতিমালার পরিপন্থী।
এজাহারে আরও বলা হয়, নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) সনদ থাকা বাধ্যতামূলক করা হলেও, অনেক প্রার্থীর বৈধ সনদ ছাড়াই নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। তদন্তে দেখা গেছে, লিখিত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্ত একজন যোগ্য প্রার্থীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত ও নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দিতে নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার আগেই ব্যাকডেটে নিয়োগপত্র ও যোগদানপত্র ইস্যু করা হয়েছিল বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
আইনজীবী ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের নিয়োগ কেলেঙ্কারি শিক্ষার গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। এই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত হলে দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গভর্নিং বডির স্বেচ্ছাচারিতা ও নিয়োগ বাণিজ্যের প্রবণতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
উল্লেখ্য, বিগত ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে রাশেদ খান মেননকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর থেকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রয়েছেন। উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের এই দুর্নীতি মামলায় তাকে নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানোর ফলে তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার পরিধি আরও বিস্তৃত হলো বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানিয়েছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এজাহারভুক্ত অন্য আসামিদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং দ্রুতই আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।