আন্তর্জাতিক ডেস্ক
কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কাতারের রাজধানী দোহায় ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই দিনব্যাপী পরোক্ষ কারিগরি আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। গত বুধবার (১ জুলাই) শেষ হওয়া এই বৈঠকে গত জুন মাসে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বাস্তবায়নের বিষয়ে বেশ কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার নিশ্চিত করেছে। তবে কৌশলগত ও স্থায়ী শান্তির পথে বড় কোনো রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সমঝোতার লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি। এই আলোচনা মূলত সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে এবং ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন ও জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী ৯ জুলাইয়ের পর পরবর্তী দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে জানা গেছে, দোহায় অনুষ্ঠিত এই দুই দিনের সংলাপে উভয় দেশের আলোচকরা মূলত হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবরুদ্ধ ইরানের ৬ বিলিয়ন (৬০০ কোটি) ডলারের তহবিল অবমুক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। গত মাসে যুদ্ধ স্থগিত করার উদ্দেশ্যে দুই দেশের মধ্যে যে প্রাথমিক চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, এই দুটি বিষয় ছিল তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। পারমাণবিক কর্মসূচির মতো স্পর্শকাতর এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিল বিষয়গুলোর আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতেই এই কারিগরি দিকগুলোর ওপর প্রথম দফায় জোর দেওয়া হচ্ছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলনের ফলাфলের ওপর ভিত্তি করে এই দোহা বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সমঝোতা স্মারকের শর্তাবলি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। বৈঠকের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বদানকারী দেশটির আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদী জানান, লেবানন সীমান্তে সংঘাত বন্ধে ওয়াশিংটনের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের ব্যর্থতার বিষয়টি তেহরানের পক্ষ থেকে এই বৈঠকে শক্তভাবে উত্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে অবরুদ্ধ ৬ বিলিয়নের একটি অংশ কীভাবে খরচ করা হবে এবং তা দিয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ জরুরি চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী ক্রয়ের প্রক্রিয়া কেমন হবে, সে বিষয়ে উভয় পক্ষ একটি রূপরেখায় একমত হতে পেরেছে।
এদিকে, ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দাবি করেছেন যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ আলোচনা এগিয়ে নিয়ে গেছে। তিনি একে একটি ‘খুব ভালো বৈঠক’ বলে অভিহিত করেন। তবে ট্রাম্পের এই দাবির বিপরীতে আলোচনায় অংশ নেওয়া কারিগরি দলগুলোর নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এই দফার বৈঠকে পারমাণবিক ইস্যুটি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো উত্থাপিতই হয়নি। পরবর্তীতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সাংবাদিকদের জানান যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং আগামী দিনগুলোতে এ বিষয়ে মূল আলোচনা শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধিরা দোহায় উপস্থিত থাকলেও তারা সরাসরি কারিগরি সেশনে বসেননি, বরং কাতারি কর্মকর্তাদের সাথে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা করেছেন।
আলোচনার অন্যতম মূল এজেন্ডা ছিল হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই কৌশলগত নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রাথমিক চুক্তি অনুযায়ী এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার কথা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনও বেশ অস্থিতিশীল। গত সপ্তাহের শেষভাগেও একটি পণ্যবাহী জাহাজে ইরানি হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। ইরানের উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তেহরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের আন্তর্জাতিক কর্তৃত্বের পূর্ণ স্বীকৃতি আদায়ে বদ্ধপরিকর এবং প্রয়োজনে তারা শক্তি প্রয়োগ করতেও দ্বিধা করবে না। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী বর্তমানে টোলমুক্ত সুবিধা সচল থাকলেও আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে এই সময়সীমা শেষ হলে ইরান এই পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর টোল আরোপের পরিকল্পনা করছে।
সংঘাত এড়াতে এবং যেকোনো ধরনের লঙ্ঘন তদারকি করতে উভয় পক্ষ একটি জরুরি যৌথ যোগাযোগ চ্যানেল বা মনিটরিং গ্রুপ গঠনের বিষয়ে একমত হয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা উভয় দেশের প্রতিনিধিদের ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে বসিয়ে এই পরোক্ষ আলোচনা পরিচালনা করেন। যদিও কারিগরি ও অর্থনৈতিক বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হয়েছে, তবুও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা, পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিতকরণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের মতো প্রধান অমীমাংসিত সংকটগুলো নিরসনে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো গভীর মতপার্থক্য ও পারস্পরিক আস্থার সংকট রয়ে গেছে।