আইন আদালত ডেস্ক
বিদেশি প্রতিষ্ঠানে পণ্য রফতানির আড়ালে প্রায় সাড়ে ২৮ লাখ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা শতকোটি টাকার বেশি) বিদেশে পাচারের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য আগামী ২৩ জুলাই দিন ধার্য করেছেন আদালত। আজ বুধবার (১ জুলাই) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুন আসামিপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. আরিফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, পূর্বনির্ধারিত কার্যসূচি অনুযায়ী আজ বুধবার মামলাটির অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য ছিল। তবে মামলার শুনানি পেছানোর জন্য আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. সজিবুল ইসলাম আদালতে একটি সময়ের আবেদন দাখিল করেন। বিজ্ঞ বিচারক আসামিপক্ষের যৌক্তিকতা বিবেচনা করে আবেদন মঞ্জুর করেন এবং আগামী ২৩ জুলাই শুনানির পরবর্তী দিন নির্ধারণ করেন। মামলাটিতে সালমান এফ রহমান ছাড়া অন্য অভিযুক্ত আসামিরা হলেন— বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান এ এস এফ রহমান, অটাম লুপ অ্যাপারেলস লিমিটেড ও পিয়ারলেস গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াসিউর রহমান, পরিচালক রেজিয়া আক্তার, আরআর গ্লোবাল ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান এবং আহমেদ শাহরিয়ার রহমান।
মামলার নথিপত্র ও অভিযোগ বিবরণী থেকে জানা যায়, সরকারের আর্থিক অপরাধ তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এক বিশেষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে বেক্সিমকো গ্রুপের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের তথ্য উদঘাটন করে। সিআইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বেক্সিমকো গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান অটাম লুপ অ্যাপারেলস লিমিটেড এবং পিয়ারলেস গার্মেন্টস লিমিটেডের মাধ্যমে এই অর্থ পাচারের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়েছে। এর মধ্যে অটাম লুপ অ্যাপারেলসের নামে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিস শাখা থেকে তিনটি ঋণপত্র (এলসি) খোলার মাধ্যমে বিদেশে পণ্য রফতানি করা হয়েছিল। তবে পণ্য রফতানি করা হলেও আইনানুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রফতানিমূল্য বাবদ ২৮ লাখ ৩২ হাজার ৪২৮ মার্কিন ডলার বাংলাদেশে ফেরত আনা হয়নি।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এই রফতানি করা পণ্যসামগ্রী সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান ‘আরআর গ্লোবাল ট্রেডিং এফজেডই’-এর ঠিকানায় পাঠানো হয়েছিল। সিআইডির অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যে, উক্ত ওভারসিজ প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিকানায় রয়েছেন সালমান এফ রহমানের ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান এবং তার নাতি আহমেদ শাহরিয়ার রহমান। ব্যাংকিং ও আমদানি-রফতানি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে একই পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত বিদেশী প্রতিষ্ঠানে পণ্য রফতানি দেখিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে এই অর্থ বিদেশে রেখে দেওয়া হয়, যা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিং অপরাধের শামিল।
দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের উপ-পরিদর্শক (এসআই) গোলাম মোস্তফা বাদী হয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে এই মানি লন্ডারিং মামলাটি দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে সিআইডি। দীর্ঘ তদন্ত ও তথ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাই শেষে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের পরিদর্শক মো. ছায়েদুর রহমান আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন।
আইনজীবী ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ডলার সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় রফতানি আয়ের আড়ালে বা ওভার-ইনভয়েসিং ও আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের ঘটনা দেশের ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সালমান এফ রহমানের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও সাবেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে আনা এই অর্থ পাচার মামলার সুষ্ঠু বিচার দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচার রোধে একটি দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা। আগামী ২৩ জুলাই অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই আলোচিত মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে।