আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনার মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। গত রবিবার কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। কুয়েতের প্রতিরক্ষা বাহিনী তাদের আকাশসীমায় দুটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও, বাহরাইনে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী একটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এই হামলার পর তেহরান হুশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন হামলা বন্ধ না করলে আগামী মঙ্গলবার থেকে শুরু হতে যাওয়া শান্তি আলোচনা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।
এর আগে, গত শনিবার কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানির তেলবাহী পানামার পতাকাবাহী জাহাজ ‘এম/টি কিকু’ হরমুজ প্রণালির কাছে ড্রোন হামলার শিকার হয়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই হামলার তথ্য নিশ্চিত করার পর মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ড্রোন মজুত কেন্দ্রগুলোতে বিমান হামলা চালায়। মার্কিন এই পদক্ষেপের পাল্টা জবাব হিসেবে রবিবার কুয়েত ও বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান। ঘটনার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক বিবৃতিতে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, হরমুজ প্রণালি অবশ্যই তেহরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং এর বাইরে নতুন কোনো ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলবে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান আঞ্চলিক শান্তি চুক্তিটি আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে লেবানন ও সিরিয়া ফ্রন্টের বহুমাত্রিক সংঘাত। সম্প্রতি ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে একটি কাঠামো চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সীমান্ত এলাকায় সংঘর্ষ থামেনি। দক্ষিণ লেবাননের দেইর সিরিয়ান এলাকায় হিজবুল্লাহর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর গোলানি ব্রিগেডের এক প্লাটুন কমান্ডার নিহত হয়েছেন। অঞ্চলটিতে বিক্ষিপ্ত সংঘাত অব্যাহত রয়েছে এবং হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তাদের লড়াই চলবে।
পাশাপাশি, দক্ষিণ সিরিয়ার দারা প্রদেশের আবদিন গ্রামেও ইসরায়েলি গোলন্দাজ বাহিনী হামলা চালিয়েছে, যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এই বহুমুখী সংঘাতের প্রেক্ষিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ একটি বিশেষ ‘সংঘাত নিয়ন্ত্রণ ইউনিট’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই ইসরায়েলকে হামলা বন্ধে বাধ্য করতে হবে এবং দক্ষিণ লেবাননের দখলকৃত এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করতে হবে।
উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেও মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতার জানিয়েছে, কাতারের রাজধানী দোহায় নির্ধারিত কারিগরি ও কূটনৈতিক আলোচনা মঙ্গলবার যথাসময়ে শুরু হবে। এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। বিশেষ করে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর এই আলোচনায় জোর দেওয়া হবে।
প্রথমত, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন চলাচল নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ও সামগ্রিক পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণ। তৃতীয়ত, তেহরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং চতুর্থত, এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রবিবারের এই পাল্টাপাল্টি হামলার পর দোহা বৈঠকের সাফল্য এখন সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে।