আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলসীমায় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের আটটি সামরিক স্থাপনায় সফলভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে সেগুলো ধ্বংস করার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে এই সামরিক অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। মূলত পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের সামরিক আধিপত্য পুনর্প্রতিষ্ঠা এবং সম্প্রতি ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন বিমান হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে তেহরান এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা গেছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে দীর্ঘদিনের সংঘাতপ্রবণ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনী ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সূত্রগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আইআরজিসির নৌ ও বিমান বাহিনী যৌথভাবে এই অভিযান পরিচালনা করে। হামলায় বিপুল সংখ্যক অত্যাধুনিক ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। কুয়েতের আলী আল-সালেম বিমান ঘাঁটি এবং বাহরাইনে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের (ফিফথ ফ্লিট) গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্য করে এই আক্রমণ চালানো হয়। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকা সিরিক ও কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দিতেই এই প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হয়েছে।
এর আগে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের বেশ কিছু কৌশলগত অবস্থানে বিমান হামলা চালানো হয়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়, আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই অভিযান চালানো হয়েছিল। মার্কিন বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক নজরদারি অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং সমুদ্রসীমায় মাইন স্থাপনের সক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তারা এই আগাম প্রতিরোধমূলক হামলা চালিয়েছিল।
মার্কিন সামরিক অভিযানের পরপরই ইরানের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে। আইআরজিসির নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সিরিক ও কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের অবৈধ বিমান হামলা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একক ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণকে কোনোভাবেই দুর্বল করতে পারেনি। বরং এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য এটি একটি কঠোর সতর্কবার্তা। ইরানের সামরিক কমান্ড স্পষ্ট করে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের অন্য সব সামরিক ঘাঁটি এবং স্থাপনাগুলো আগামী দিনগুলোতে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হবে।
এদিকে কুয়েত ও বাহরাইন প্রশাসন ইরানের এই আকস্মিক হামলার পর তাদের নিজ নিজ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশ কিছু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে থাকা অবস্থাতেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। বাহরাইনের পক্ষ থেকেও আকাশসীমা লঙ্ঘনের এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে এবং একে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার ফলে ওই অঞ্চলে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলোকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করায় দুই দেশের মধ্যে চলমান পরোক্ষ সংঘাত এখন সরাসরি যুদ্ধের রূপ নিতে পারে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত করাসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।