আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের বন্দরনগরী করাচিতে আধা-সামরিক বাহিনী ‘সিন্ধু রেঞ্জার্স’-এর সদর দফতরে এক ভয়াবহ সশস্ত্র হামলার ঘটনায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চারজন হামলাকারী এবং তিনজন নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা উভয় পক্ষের তীব্র গোলাগুলির পর নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।
শনিবার (২৭ জুন) সন্ধ্যায় করাচির পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা গুলিস্তান-ই-জওহরে অবস্থিত সিন্ধু রেঞ্জার্সের সদর দফতরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই পুরো এলাকা অবরুদ্ধ করে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে পাকিস্তানের বিশেষায়িত নিরাপত্তা বাহিনীগুলো।
সিন্ধু পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) জাভেদ আলম ওধো গণমাধ্যমকে জানান, প্রাথমিক তদন্তের সূত্র ধরে জানা গেছে, হামলাকারীরা বিস্ফোরক বোঝাই একটি গাড়ি নিয়ে রেঞ্জার্স সদর দফতরের প্রধান ফটকে ধাক্কা দেয়। সদর দফতরের নিরাপত্তা চৌকি ভেঙে ভেতরে প্রবেশের উদ্দেশ্যে এই কৌশল নেওয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রধান ফটকে আঘাত হানার পরপরই ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ও আত্মঘাতী জ্যাকেট পরিহিত হামলাকারীরা ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রবেশ করে এবং কর্তব্যরত নিরাপত্তাকর্মীদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ ও গোলাগুলি শুরু হয়। তবে প্রধান ফটকে আঘাত হানা গাড়িটিতে কোনো বিস্ফোরণ ঘটেছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও বিশদ ফরেনসিক তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, হামলার সূচনালগ্নে বিকট শব্দের পর টানা বেশ কিছু সময় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের আওয়াজ পাওয়া যায়। এতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে গুলিস্তান-ই-জওহর ও এর আশেপাশের এলাকা। হামলার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় সিন্ধু পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা ইউনিট (এসএসইউ), অ্যান্টি-টেররিস্ট স্কোয়াড এবং সিন্ধু রেঞ্জার্সের অতিরিক্ত সুসজ্জিত দল। তারা যৌথভাবে সদর দফতরের চারপাশ ঘিরে ফেলে হামলাকারীদের লক্ষ্য করে পাল্টা অভিযান শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযানে ভবনের ভেতরে অবস্থান নেওয়া চার হামলাকারীই নিহত হয়। তবে এই বন্দুকযুদ্ধে রেঞ্জার্সের তিনজন সদস্যও কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ হারান।
সদর দফতরটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত ঘোষণা করার পরও আশেপাশের সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং কোনো সহযোগী আত্মগোপন করে আছে কি না তা তল্লাশি করতে ওই এলাকায় সেনা ও পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী বা সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে সিন্ধু প্রদেশ এবং বিশেষ করে করাচি শহরে অতীতে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে এ ধরনের নাশকতা চালিয়েছে।
এদিকে এই সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন সিন্ধুর মুখ্যমন্ত্রী সৈয়দ মুরাদ আলি শাহ। তিনি এই ঘটনাকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার একটি অপচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী নিহত নিরাপত্তাকর্মীদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করার পাশাপাশি ঘটনার নেপথ্যের কারণ ও নিরাপত্তা ত্রুটি খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলার বিশদ ও পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তার দপ্তরে জমা দেওয়ার জন্য সিন্ধু পুলিশের আইজি ও রেঞ্জার্সের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, করাচির মতো অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল নগরীতে রেঞ্জার্সের মতো একটি আধা-সামরিক বাহিনীর সদর দফতরে হামলা চালানো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি পাকিস্তানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং কাউন্টার-টেররিজম বা সন্ত্রাস দমন কৌশলের কার্যকারিতাকে নতুন করে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাল। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই ধরনের ঘটনা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।