আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের প্রভাবে দেশটিতে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গত বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় সংঘটিত এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৯২০ জনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জাতিসংঘ সূত্রে জানা গেছে, যা দেশটিকে এক চরম অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী কারাকাস এবং এর সংলগ্ন উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাগুলো এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রথম ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূ-পৃষ্ঠের ২০ দশমিক ৩ কিলোমিটার গভীরে। এর পরপরই আঘাত হানা দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পের এই গভীরতা কম হওয়ায় কম্পনের তীব্রতা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জাতিসংঘের ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার দুর্যোগ পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং পরিস্থিতির তীব্রতায় নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে আরও অনেক বেশি হতে পারে। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ উদ্ধারকাজ তদারকি করছেন। রদ্রিগেজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অন্তত ২০০ জন জীবিত আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে উদ্ধারকাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। উদ্ধারকাজের এই ধীরগতিতে স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্পেন, এল সালভাদর, সুইজারল্যান্ড, কলম্বিয়া ও মেক্সিকোসহ মোট ১৭টি দেশের বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল বর্তমানে ঘটনাস্থলে কাজ করছে। ত্রাণ কার্যক্রম এবং উদ্ধার অভিযানের জটিল প্রক্রিয়া সমন্বয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও কারাকাসে পৌঁছেছেন, যা আন্তর্জাতিক মহলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার এই ভৌগোলিক অবস্থান দীর্ঘকাল ধরেই ভূমিকম্পপ্রবণ হিসেবে পরিচিত। ভূ-তাত্ত্বিকদের মতে, ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে দেশটির অবস্থান হওয়ায় এখানে নিয়মিত বিরতিতে ভূতাত্ত্বিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এর আগে ১৯০০ সালে দেশটিতে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল, যা সে সময় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আজকের আধুনিক যুগেও একই অঞ্চলের ভূমিকম্পপ্রবণ প্রকৃতি ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। হাসপাতালগুলোতে আহত মানুষের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। পর্যাপ্ত চিকিৎসাসামগ্রী ও ওষুধের অভাবে অনেক জায়গায় চিকিৎসা সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। উদ্ধারকর্মীদের মতে, সময়ের সাথে সাথে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে।
এই মানবিক সংকটের গভীরতা কেবল বর্তমান উদ্ধারকাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা। গৃহহীন হয়ে পড়া হাজারো মানুষের আবাসন, খাদ্য সরবরাহ এবং সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধের মতো চ্যালেঞ্জগুলো এখন সরকারের সামনে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনা ভেনেজুয়েলার জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিলেও, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।