আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়া, ভেনেজুয়েলা ও জাপানে ধারাবাহিক ভূমিকম্পের পর প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে মোবাইল প্রযুক্তির আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। চলতি জুনের শুরুতে ফিলিপাইনের মিন্দানাও অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ৩৭ জনের মৃত্যু হলেও লাখ লাখ মানুষ মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা পাওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, জাপান, তুরস্ক, রোমানিয়া, চীন, ইতালি ও তাইওয়ানের মতো দেশে প্রাতিষ্ঠানিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে ভেনেজুয়েলায় রাষ্ট্রীয়ভাবে এমন ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও গত বুধবার রাতে আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার শতাব্দীর ভয়াবহতম দুটি ভূমিকম্পে গুগলের ‘অ্যান্ড্রয়েড আর্থকোয়েক অ্যালার্ট সিস্টেম’ ব্যবহারকারীদের প্রাণ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
মোবাইল ফোনের নিজস্ব সেন্সর থেকে তথ্য সংগ্রহ করে গুগলের এই সতর্কীকরণ ব্যবস্থাটি পরিচালিত হয়। বার্কলে সিসমোলজি ল্যাবের পরিচালক রিচার্ড অ্যালেন জানান, ২০২০ সালে চালুর সময় এই সেবার আওতায় ২৫ কোটি গ্রাহক থাকলেও বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে ২৫০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। বৈশ্বিকভাবে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৬০টি ভূমিকম্পের জন্য ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি মোবাইল ফোনে এই সতর্কবার্তা পাঠানো হচ্ছে। সিসমোলজিস্টদের মতে, ভূমিকম্পের সময় মূলত তিন ধরনের তরঙ্গ তৈরি হয়। এর মধ্যে প্রথম ও দ্রুততম তরঙ্গ হলো ‘পি-ওয়েভ’ (P-wave), যা মৃদু কম্পন সৃষ্টি করে। এরপর ক্রমান্বয়ে আসে বিপজ্জনক ‘এস-ওয়েভ’ (S-wave) এবং সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ‘এল-ওয়েভ’ (L-wave)। কোনো এলাকার একাধিক মোবাইল সেন্সর প্রথম তরঙ্গটি (P-wave) শনাক্ত করার সাথে সাথে গুগলের কেন্দ্রীয় সার্ভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডেটা বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ব্যবহারকারীদের কয়েক সেকেন্ড বা মিনিট আগে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দেয়।
বুধবার ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ভূমিকম্পের সময় দেশটির রাজধানী কারাকাসের বাসিন্দা পেরিক্লিস সানচেজ প্রধান কম্পন শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট আগেই ফোনে অ্যান্ড্রয়েড অ্যালার্ট পান এবং নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সক্ষম হন। একইভাবে পার্শ্ববর্তী দেশ কলম্বিয়ার বোগোটায় অবস্থানরত ভেনেজুয়েলার প্রবাসী ডায়োজেনেস লোপেজও ডিজিটাল মানচিত্রের মাধ্যমে ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র এবং তীব্রতা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পান। বিশেষজ্ঞরা জানান, চিলি বা জাপানের মতো ভেনেজুয়েলার নাগরিকরা সচরাচর ভূমিকম্পের সাথে অভ্যস্ত নন, ফলে এই প্রযুক্তিগত সতর্কতা সেখানে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বড় অবদান রাখছে। তবে সতর্কীকরণ ব্যবস্থার একটি প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের অতি কাছাকাছি থাকা ব্যবহারকারীরা প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পান না। অপরদিকে উৎপত্তিস্থল থেকে দূরবর্তী স্থানে অবস্থানকারীরা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য মূল্যবান কয়েক সেকেন্ড বা মিনিট বেশি সময় পেয়ে থাকেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই প্রযুক্তির প্রয়োগ ও আধুনিকায়নের ভিন্ন ভিন্ন চিত্র রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে ক্যালিফোর্নিয়া, ওরেগন ও ওয়াশিংটনে ইউএসজিএস সরকারিভাবে ‘শেকঅ্যালার্ট’ নামক ব্যবস্থা পরিচালনা করে। সংস্থাটির বিজ্ঞানী রবার্ট ডি গ্রুট জানান, বুধবারে সংঘটিত ভূমিকম্পে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে আগাম সতর্কবার্তা পাঠানো সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে, ১৯৯১ সালে মেক্সিকোতে বিশ্বের প্রথম সাধারণ নাগরিকদের জন্য আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু করা হয়, যা বর্তমানে নিয়মিত দুর্যোগ মহড়ার অংশ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে জাপান। ২০১১ সালের ৯.০ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির পর দেশটির সরকার সমুদ্রের তলদেশে ‘এস-নেট’ (S-Net) নামক আধুনিক সেন্সর নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছে। এই সমুদ্রতলদেশীয় ব্যবস্থাটি মূল ভূখণ্ডের চেয়ে ২০ সেকেন্ড আগে ভূমিকম্প এবং ২০ মিনিট আগে সুনামির নিখুঁত পূর্বাভাস দিতে সক্ষম, যা ভবিষ্যতে সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশগুলোর জন্য দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।