আন্তর্জাতিক ডেস্ক
লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় গত এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এই ধারাবাহিক ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ৩২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন সাত শতাধিক মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষ আটকা পড়ে থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছে প্রশাসন।
দেশটির রাজধানী কারাকাসের বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সী লুইস আলেহান্দ্রো রুইস গার্সিয়া এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, ভূমিকম্প আঘাত হানার কয়েক সেকেন্ড পূর্বে তিনি তার মুঠোফোনে গুগলের স্বয়ংক্রিয় ভূমিকম্প সতর্কবার্তা (আর্থকোয়েক অ্যালার্ট) লাভ করেন। এর পরপরই তীব্র কম্পন শুরু হয়, যার শব্দ ছিল কোনো বিমানের টারবাইনের গর্জনের মতো। কম্পনের তীব্রতায় ঘরের আসবাবপত্র ভেঙে পড়তে থাকে এবং ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দ্রুত ভবন থেকে বের হয়ে খোলা স্থানে আশ্রয় নিতে সক্ষম হন।
বহির্গমনের পর রাজপথের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী, ভূমিকম্পের তীব্রতায় বহুতল ভবন ধসে সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো অঞ্চলের সদৃশ রূপ ধারণ করেছিল। চারদিকে ভেঙে পড়া দেয়াল, লোহার গ্রিল এবং ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে আটকে পড়া মানুষের আর্তনাদ ও সাহায্যের আকুল আবেদন শোনা যাচ্ছিল। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে দুর্যোগের যে চিত্র সামনে আসছে, তা ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে অন্যতম অন্ধকার ও ট্রাজিক অধ্যায় হিসেবে রূপ নিয়েছে।
ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক অবস্থানগত কারণে ভেনেজুয়েলা ক্যারিবিয়ান ও দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় অঞ্চলটি দীর্ঘকাল ধরেই ভূমিকম্পপ্রবণ। তবে এবারের জোড়া ভূমিকম্পের তীব্রতা পূর্বের সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। আকস্মিক এই বিপর্যয়ের ফলে দেশটির বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও জরুরি সেবা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। রাজধানী কারাকাসের প্রধান সড়কগুলো ধ্বংসস্তূপের কারণে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় উদ্ধারকারী দলগুলোর পক্ষে উপদ্রুত এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ ও সামরিক বাহিনী যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে। তবে ভারী যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই দুর্যোগ গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেশটির স্বাস্থ্য খাত ও অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনার ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করবে। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের গতি প্রকৃতির ওপরই নির্ভর করছে দেশটির স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার প্রক্রিয়া।