আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। রিখটার স্কেলে এর একটির মাত্রা ছিল ৭.২ এবং অপরটির ৭.৫। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির আশঙ্কায় দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার। রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক বহুতল ভবন ধসে পড়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধের পাশাপাশি সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহন সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদারে দেশজুড়ে সেনাবাহিনী ও বলিভারিয়ান ন্যাশনাল গার্ডকে মোতায়েন করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশটিতে রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দিয়ে জনগণকে শান্ত ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানান, ভূমিকম্পে সৃষ্ট মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণে মাইকেতিয়ায় অবস্থিত সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সকল কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সমস্ত স্কুল-কলেজের পাঠদান এবং রাজধানী কারাকাসের পাতালরেল (মেট্রো) ও শহরতলির রেল যোগাযোগ স্থগিত করা হয়েছে। জরুরি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন ছাড়া অন্য সব ধরনের বাণিজ্যিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম আপাতত বন্ধ থাকবে। প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ আরও জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং বলিভারিয়ান ন্যাশনাল গার্ডের কমান্ডারের নেতৃত্বে উদ্ধার তৎপরতা পরিচালিত হচ্ছে।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেয়ো জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পরপরই ফায়ার সার্ভিস, সিভিল প্রটেকশন ও জরুরি উদ্ধারকারী দলগুলোকে উপদ্রুত এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক জরুরি ভাষণে তিনি নাগরিকদের বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, রাজধানী কারাকাসের আলতামিরা ও পালোস গ্রান্দেস এলাকার পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সেখানে বেশ কিছু ভবন ধসে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। উদ্ধারকাজের সুবিধার্থে এবং আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য তিনি চালকদের রাস্তা ফাঁকা রাখার অনুরোধ করেছেন। এ ছাড়া পরবর্তী আফটারশক বা অনুকম্পনের ঝুঁকির কারণে নাগরিকদের ক্ষতিগ্রস্ত বা ফাটল ধরা ভবনে প্রবেশ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গৌণ দুর্ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ড এড়াতে কিছু এলাকার আবাসিক গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় বুধবার শেষ বিকেলে মাত্র ৪৫ সেকেন্ডের ব্যবধানে পরপর এই দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। প্রথম ভূমিকম্পটি কারাকাস থেকে প্রায় ২৮৪ কিলোমিটার পশ্চিমে ইয়্যারাকুই রাজ্যের সান ফেলিপের কাছে ভূপৃষ্ঠের ১৫ কিলোমিটার গভীরে আঘাত হানে, যার মাত্রা ছিল ৭.২। এর ঠিক পরপরই রাজধানী থেকে প্রায় ২৯৩ কিলোমিটার পশ্চিমে ইউমারের কাছে ভূপৃষ্ঠের মাত্র ১৩.২ কিলোমিটার গভীরে ৭.৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে ‘সিসমিক ডাবলেট’ বা জোড়া ভূমিকম্প হিসেবে অভিহিত করেছেন। ভূমিকম্পের তীব্র কম্পন পার্শ্ববর্তী দেশ ব্রাজিল ও কলম্বিয়াতেও অনুভূত হয়েছে এবং পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় অন্তত ২০টি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে।
ইউএসজিএস তাদের প্রাথমিক মূল্যায়নে সতর্ক করে জানিয়েছে, এই দুর্যোগের ফলে ভেনেজুয়েলায় ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। সংস্থাটির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, এই জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার থেকে ১ লাখের মধ্যে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে প্রাণহানি ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ৪৪ শতাংশ এবং ১ লাখের বেশি হওয়ার আশঙ্কা ৩০ শতাংশ বলে জানানো হয়েছে। বিশেষ করে পুয়ের্তো কাবেয়ো, সান ফেলিপ ও ওকুমারে দে লা কোস্তা অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি হতে পারে। ভেনেজুয়েলা সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে প্রাণহানির সত্যতা নিশ্চিত করে শোক প্রকাশ করা হয়েছে, তবে সুনির্দিষ্ট ও আনুষ্ঠানিক হতাহতের কোনো পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশ করা হয়নি। আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো উপদ্রুত এলাকার জরুরি চিকিৎসা ও ত্রাণ চাহিদা মেটাতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে।