আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতার মাঠের লড়াই শুরুর আগেই মাঠের বাইরের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতায় নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো সীমান্ত। মেক্সিকোর তিজুয়ানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরান জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক মেহেদি তারেমি এবং সহকারী কোচ সাঈদ আলহোইকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে বাধা সৃষ্টি ও হয়রানির তীব্র অভিযোগ তুলেছে ইরান ফুটবল ফেডারেশন (এফএফআইআরআই)। এই প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ইরান দলের পূর্বনির্ধারিত ভ্রমণ সূচি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের তৃতীয় ম্যাচে মিশরের মুখোমুখি হওয়ার জন্য ইরান ফুটবল দলের যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে যাওয়ার কথা ছিল। মেক্সিকোর তিজুয়ানা বিমানবন্দর হয়ে তাদের এই সীমান্ত পারাপারের কথা থাকলেও সেখানে আকস্মিকভাবে দলের অধিনায়ক মেহেদি তারেমি ও সহকারী কোচ সাঈদ আলহোইকে মার্কিন অভিবাসন ও নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের অনুরোধে আটকে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় পুরো দলের সিয়াটল যাত্রা সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায়। ইরান ফুটবল ফেডারেশন এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দলের মূল চালিকাশক্তি ও অধিনায়ককে বিমানবন্দরে রেখে বাকি সদস্যরা সিয়াটলের উদ্দেশ্যে যাত্রা না করার সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেন। ফলে পুরো দলকেই বিমানবন্দরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
এই ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এবং বিশ্বকাপ আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, ইরান জাতীয় দলকে ম্যাচের অন্তত দুই দিন আগে কোনো প্রকার জটিলতা ছাড়াই নির্বিঘ্নে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। তবে মাঠ পর্যায়ের এই আকস্মিক আটকাদেশ ও নথিপত্র যাচাইয়ের দীর্ঘসূত্রতা মার্কিন প্রশাসনের পূর্ববর্তী আশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র প্রদর্শন করেছে। এর ফলে খেলোয়াড়দের মানসিক প্রস্তুতি এবং ম্যাচ পূর্ববর্তী অনুশীলনের সময়সূচি ব্যাহত হয়েছে বলে ইরানি শিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং উত্তেজনাপূর্ণ। ক্রীড়াঙ্গনে এর আগেও এই দুই দেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়তে দেখা গেছে। ইরান ফুটবল ফেডারেশন তাদের বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, ফুটবল বিশ্বকাপের মতো একটি বৈশ্বিক ও নিরপেক্ষ আসরের সহ-আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দেশের খেলোয়াড় এবং কর্মকর্তাদের জন্য বৈষম্যহীন ও নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক ইস্যুকে ক্রীড়াঙ্গনে টেনে এনে একটি নির্দিষ্ট দলের ওপর বারবার এমন মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফার (FIFA) নীতিমালার পরিপন্থী।
উল্লেখ্য, চলতি বিশ্বকাপে এটিই ইরানের সাথে ঘটা প্রথম ঘটনা নয়। এর আগেও গ্রুপ পর্বে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ শেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে মেক্সিকোয় ফেরার পথে একই ধরণের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল ইরান দলকে। সেবারও পাসপোর্ট এবং ভিসা সংক্রান্ত অতিরিক্ত যাচাই-বাছাইয়ের অজুহাত দেখিয়ে অধিনায়ক মেহেদি তারেমি ও সহকারী কোচ সাঈদ আলহোইকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয়েছিল। একই ব্যক্তিদের বারবার লক্ষ্যবস্তু করায় এটিকে সাধারণ নিরাপত্তা পরীক্ষা না বলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি হিসেবে দেখছে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, মেগা ইভেন্টগুলোতে অভিবাসন সংক্রান্ত জটিলতা নতুন কিছু নয়, তবে একই দলের শীর্ষ কর্মকর্তা ও তারকা খেলোয়াড়কে বারবার আটকে রাখার ঘটনা দলের মাঠের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে সিয়াটলে মিশরের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে দলের অধিনায়কের এই ধরণের প্রশাসনিক জটিলতায় পড়া ইরানের কৌশলগত প্রস্তুতিকে বাধাগ্রস্ত করবে। এই ঘটনার পর ফিফা এবং মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো জানা যায়নি। তবে কূটনৈতিক এবং ক্রীড়া উভয় ক্ষেত্রেই এই ঘটনা আগামী দিনগুলোতে নতুন বিতর্কের জন্ম দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।