বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, যুগোপযোগী ও শিশু-বান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জাপানের সফল অভিজ্ঞতা, কারিকুলাম উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) কারিগরি সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পর্যায়ক্রমে ‘ম্যাথ ল্যাব’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
বুধবার (২৪ জুন) সচিবালয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর কার্যালয়ে জাইকা বাংলাদেশের চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ তাকাহাশি জুনকোর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে সরকারের এই অবস্থান তুলে ধরা হয়। বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য একটি নতুন ও আধুনিক কারিকুলাম প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। নতুন এই শিক্ষাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে সিভিক এডুকেশন বা নাগরিক শিক্ষা, ক্রীড়া শিক্ষা, সাংস্কৃতিক শিক্ষা, গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষার মানোন্নয়নকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং অথচ আনন্দময় ও ভীতিহীন শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা, যাতে তাদের সুপ্ত প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটতে পারে।
জাপানের নাগরিক শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত উল্লেখ করে বৈঠকে জানানো হয়, বাংলাদেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৈশব থেকেই দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও নাগরিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জাপানের শিক্ষাপদ্ধতি একটি অনন্য মডেল হতে পারে। জাইকার সহযোগিতায় এই অভিজ্ঞতাগুলো বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সফলভাবে সংযোজন করা সম্ভব বলে মনে করেন নীতিনির্ধারকেরা।
এ ছাড়া প্রাথমিক স্তরে গণিত শিক্ষাকে আরও আকর্ষণীয়, সহজবোধ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ধাপে ধাপে ‘ম্যাথ ল্যাব’ স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিজ্ঞান গবেষণাগারের আদলে তৈরি এই ল্যাবগুলো শিক্ষার্থীদের গণিতের ভীতি দূর করতে এবং তাদের মধ্যে যৌক্তিক চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করবে। এই ল্যাবগুলোর সুষ্ঠু পরিচালনা ও শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে জাইকার কারিগরি সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কারিকুলামের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের কাঠামোগত ও প্রশাসনিক সংস্কারের ওপরও বিশেষ জোর দিচ্ছে সরকার। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে থাইল্যান্ড ও তুরস্কের সফল শিক্ষা প্রশাসন ব্যবস্থা ও তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। দেশের মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা অফিসসমূহের কাজের পরিধি বৃদ্ধি, কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন (কেপিআই) এবং সার্বিক মনিটরিং ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক সুশাসন নিশ্চিত করবে।
জাইকা প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে বর্তমান সরকারের গৃহীত উদ্যোগগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং চলমান দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তারা নতুন কারিকুলাম উন্নয়ন, শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম সম্প্রসারণ, শিক্ষা প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদারকরণ এবং প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিশু-বান্ধব শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে সম্ভাব্য সব ধরনের কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা প্রদানের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
উচ্চপর্যায়ের এই দ্বিপাক্ষিক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. মোখলেছুর রহমান, যুগ্মসচিব (পরিকল্পনা) মো. ছাইফুল ইসলাম, সিনিয়র সহকারী সচিব মো. ইকবাল হাসান এবং জাইকা বাংলাদেশের সিনিয়র রিপ্রেজেন্টেটিভ মনিকাওয়া ইউকোসহ উভয় পক্ষের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।