আন্তর্জাতিক ডেস্ক
কাতারের রাজপরিবারের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উপহার হিসেবে দেওয়া বোয়িং ৭৪৭-৮ আই জাম্বো জেট বিমানটিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সরকারি বিমান তথা ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ হিসেবে ব্যবহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অসামরিক এই বিমানটিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের উপযোগী ও সম্পূর্ণ নিরাপদ করতে বর্তমানে এর অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন ও সামরিক রূপান্তরের কাজ চলছে। নতুন প্রযুক্তির এই বিমানটি যুক্ত হওয়ার ফলে দীর্ঘ তিন দশক ধরে সেবা দেওয়া বর্তমান বিমানগুলোর ওপর চাপ কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন বিমানবাহিনী জানিয়েছে, নতুন বোয়িং বিমানগুলো ২০২৮ সালের মধ্যে সরবরাহ না হওয়া পর্যন্ত কাতারের এই জেটটি একটি ‘সেতু’ বিমান (ব্রিজ এয়ারক্রাফট) হিসেবে কাজ করবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে আকাশে ওড়ার আগে শীঘ্রই এই বিমানটির চূড়ান্ত পরীক্ষা বা ‘কমিশনিং ফ্লাইট’ শুরু করা হবে। বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে দুটি প্রধান বিমান ব্যবহার করেন, সেগুলো মূলত ১৯৯০ সালের শুরুতে সেবা দেওয়া বোয়িং ৭৪৭-২০০ সিরিজের ‘ভিসি ২৫ এ’ মডেলের বিমান। দীর্ঘদিন ধরে এগুলো পৃথিবীর অন্যতম নিরাপদ ও প্রযুক্তিসমৃদ্ধ বিমান হিসেবে পরিচিত হলেও, বর্তমান সময়ে এগুলোর বয়স বৃদ্ধি এবং রক্ষণাবেক্ষণ জটিলতা তৈরি হওয়ায় মার্কিন প্রশাসন নতুন প্রজন্মের বিকল্প খুঁজছিল। নিয়ম অনুযায়ী, মার্কিন বিমানবাহিনীর যে কোনো বিমান যখন দেশটির প্রেসিডেন্টকে বহন করে, তখনই সেটিকে সাময়িকভাবে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বাণিজ্যিক বা অসামরিক বিমানকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের উড়ন্ত কমান্ড সেন্টারে পরিণত করার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের তত্ত্বাবধানে বিমানটিতে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, শত্রুপক্ষের নজরদারি ও আক্রমণ প্রতিহত করার গোপন প্রযুক্তি এবং এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থা যুক্ত করা হচ্ছে। উপগ্রহের মাধ্যমে অত্যন্ত সুরক্ষিত এই ডেটা নেটওয়ার্কের ফলে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আন্তর্জাতিক সংকটের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিমানে অবস্থান করেই হোয়াইট হাউস, সামরিক কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবেন। এছাড়া কোনো ধরনের অবতরণ ছাড়াই আকাশে ওড়া অবস্থায় এই বিমানে পুনরায় জ্বালানি ভরার প্রযুক্তিগত সুবিধাও রয়েছে।
আনুমানিক ৪০ কোটি ডলার মূল্যের এই বিমানটির অভ্যন্তরীণ নকশায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের ঐতিহ্য ও আভিজাত্য বজায় রাখা হয়েছে। এর আসনগুলো বাদামি চামড়ায় মোড়া এবং সম্পূর্ণভাবে শুইয়ে দেওয়ার উপযোগী। এছাড়া বিমানটিতে একটি এক্সক্লুসিভ প্রেসিডেন্সিয়াল সুট, জরুরি চিকিৎসাসেবার জন্য একটি মেডিক্যাল ইউনিট, উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের জন্য সম্মেলন কক্ষ এবং একসঙ্গে ১০০ জনের খাবার প্রস্তুত করতে সক্ষম দুটি অত্যাধুনিক রান্নাঘর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিমানটির বাহ্যিক অংশে আমেরিকার পতাকার রঙের অনুকরণে লাল, সাদা ও গাঢ় নীল রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে এবং এর লেজে মার্কিন জাতীয় পতাকা চিত্রিত করা হয়েছে।
এদিকে, একটি বিদেশি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য এমন মহামূল্যবান উপহার প্রাপ্তির বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিরোধীরা বিদেশি সরকারের কাছ থেকে এই ধরনের উপহার গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থের প্রশ্ন তুলছেন। সমালোচকদের মতে, বিদেশি রাষ্ট্রের দেওয়া বিমানকে প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের উপযোগী করতে কঠোর নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রয়োজন, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল। অন্যদিকে, ট্রাম্পের সমর্থক ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দাবি, মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের কঠোর নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং সঠিক সামরিক রূপান্তরের মাধ্যমে এই বিমানটি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত ও সাশ্রয়ী রাষ্ট্রীীয় সম্পদে পরিণত হতে যাচ্ছে।