বিশেষ প্রতিবেদক
বিশ্বজুড়ে সংঘাত, আর্থ-সামাজিক সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২৫ কোটিরও বেশি শিশু-কিশোরের শিক্ষা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার মধ্যে বাংলাদেশের ১ কোটি ২৭ লাখ শিশু রয়েছে। একই কারণে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ শিশু স্কুল থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়েছে। গতকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘের বৈশ্বিক তহবিল ‘এডুকেশন ক্যাননট ওয়েট’ প্রকাশিত এক হালনাগাদ গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে সংকটের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং এর বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রভাবের চিত্র বিশদভাবে উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের এই গবেষণা অনুযায়ী, গত মাত্র ১৮ মাসের ব্যবধানে সংঘাত ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শিক্ষাগত সংকটের মুখে পড়া শিশুর সংখ্যা ২ কোটি ১০ লাখ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী এই ঝুঁকিতে থাকা শিশু-কিশোরের মোট সংখ্যা বর্তমানে আনুমানিক ২৫ কোটি ৮০ লাখে পৌঁছেছে। এই বিপুলসংখ্যক শিশুর বয়সই স্কুলে যাওয়ার উপযোগী, কিন্তু বিভিন্ন বৈশ্বিক ও স্থানীয় সংকটের কারণে তারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কিংবা তাদের শিক্ষা কার্যক্রম নিয়মিত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, শিক্ষাক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এই ২৫ কোটি ৮০ লাখ শিশুর প্রায় ৬০ শতাংশই মাত্র নয়টি দেশে বসবাস করে। সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই দেশগুলো হলো—বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ইথিওপিয়া, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, সুদান ও ইয়েমেন। এসব দেশে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংঘাত, ব্যাপক বাস্তুচ্যূতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাব শিক্ষা খাতের এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে স্কুলে যাওয়ার বয়সী আনুমানিক ৪ কোটি ২৮ লাখ শিশু রয়েছে। এর মধ্যে ১ কোটি ২৭ লাখ শিশুর শিক্ষা জীবন নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিঘ্নিত হচ্ছে। বাংলাদেশের এই সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগকে দায়ী করা হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ৯৮ দশমিক ১ শতাংশ শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হওয়ার পেছনে মূল কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অবশিষ্ট ১ দশমিক ৯ শতাংশ সংকটের জন্য দায়ী সাধারণ আর্থ-সামাজিক সীমাবদ্ধতা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের মতো দুর্যোগগুলো বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এডুকেশন ক্যাননট ওয়েটের পরিচালক মায়সা জালবুত এই পরিস্থিতির ওপর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বর্তমান বৈশ্বিক সংঘাত এবং জলবায়ু পরিবর্তন শিক্ষা খাতের পূর্ববর্তী অর্জনগুলোকে ক্রমান্বয়ে উল্টো দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই গবেষণা প্রতিবেদনের ফলাফলগুলো মূলত নির্দিষ্ট করে দিচ্ছে যে বিশ্বের কোন অঞ্চলগুলোয় এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সহায়তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এবং কোন খাতগুলোতে টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করলে তা শিশুদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের ফলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি ব্যাহত হতে পারে এবং বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চলমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর শিক্ষা অবকাঠামো পুনর্গঠন ও দুর্যোগসহনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে।