আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি ও জার্মানিতে রেকর্ড তাপমাত্রা নথিভুক্ত হওয়ার পাশাপাশি নদী ও জলাশয়ে ডুবে এবং মাত্রাতিরিক্ত গরমে বেশ কিছু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা, কর্মঘণ্টা পুনর্নির্ধারণ এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এই চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার জন্য বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছেন।
ফ্রান্সে চলমান এই তাপপ্রবাহের কারণে ব্যাপক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানিয়েছেন, তীব্র গরম থেকে স্বস্তি পেতে নদী ও জলাশয়ে নামতে গিয়ে শুধু ফ্রান্সেই গত বৃহস্পতিবার থেকে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নদী ও জলাশয়ে ডুবে যাওয়া ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী এবং একটি গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া দুই ও চার বছর বয়সী দুটি শিশু রয়েছে। এছাড়া লিঁও শহরের কাছে নদী থেকে উদ্ধার হওয়া এক পেশাদার ফুটবলার আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দেশটির ক্রীড়া ও যুবমন্ত্রী মারিনা ফেরারি জনসাধারণকে নিরাপত্তাহীন স্থানে সাঁতার কাটার বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
চরম আবহাওয়ার প্রভাবে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্রগুলোর পরিচালনাসূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে আইফেল টাওয়ার এবং ল্যুভ জাদুঘর। ফরাসি আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সে জুন মাসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস গড় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। একই সাথে সোমবার রাতে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম রাত পার হয়েছে, যেখানে সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ছিল ২১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া, পরিবেশগত সুরক্ষায় দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের গোলফেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
স্পেন এবং ইতালিতেও গ্রীষ্মকালীন এই তাপপ্রবাহ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। স্পেনের আন্দালুসিয়া, কান্তাব্রিয়া ও বাস্ক অঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে, যেখানে আন্দুহার এলাকায় তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। দেশটির ১০১টি আবহাওয়া কেন্দ্রে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি রেকর্ড করা হয়। অন্যদিকে, ইতালি সরকার রোম, মিলান ও ভেনিসসহ ১৫টি প্রধান শহরে ‘লাল সতর্কতা’ জারি করেছে। চরম গরমে কৃষি ও নির্মাণশ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দিনের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়ে কাজ বন্ধ রাখার রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা পুনরায় কার্যকর করা হয়েছে।
জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের অন্যান্য অংশেও গরমের তীব্রতা বাড়ছে। জার্মানিতে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করার পূর্বাভাসের মধ্যেই সপ্তাহান্তে সাঁতার কাটতে গিয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেদারল্যান্ডসে ‘কোড অরেঞ্জ’ এবং বেলজিয়ামে জাতীয় তাপপ্রবাহ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ইউরোপ মহাদেশে গ্রীষ্মের শুরুতেই তাপপ্রবাহের প্রকোপ, স্থায়িত্ব এবং তীব্রতা আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দূরপ্রসারী পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করছে।