আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, তেহরান কোনো পরিস্থিতিতেই দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা না থাকলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র গাজার মতোই ইরানকে ধ্বংস করে দিত। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতা ঘিরে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ সফরকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান আলোচনায় পাকিস্তান বর্তমানে অন্যতম মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি উল্লেখ করে বলেন, “আমাদের আত্মরক্ষার জন্য যেসব ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, সেগুলো না থাকলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র গাজার মতোই ইরানকে ধ্বংস করে দিত। তারা বৃদ্ধ বা শিশু— কাউকেই রেহাই দিত না। সুতরাং আমরা কোনো অবস্থাতেই, কারও সঙ্গে, কখনোই আমাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করব না।” ইরানের এই কঠোর অবস্থানের কারণে পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ঘিরে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক দরকষাকষি নতুন মোড় নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যস্থতাকারী পক্ষগুলোর মধ্যে হওয়া প্রাথমিক চুক্তিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে আলোচনা প্রক্রিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুটি বাদ রেখেই অন্যান্য আঞ্চলিক ও পরমাণু বিষয়াবলি প্রাধান্য পাচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করলে মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। এর জবাবে ইরানও উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলো এবং ইসরায়েলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও হাজার হাজার ড্রোন নিক্ষেপ করে পাল্টা জবাব দেয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধের সময় নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষার দুর্বলতা ও ঘাটতি পূরণে ইরান প্রথম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি গড়ে তোলে। গত কয়েক দশকে তেহরান তাদের এই কর্মসূচির পরিধি, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ও নির্ভুল আঘাত হানার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। ইরান থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে তেহরানের এই সামরিক সক্ষমতাকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য প্রধান হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। চলমান সংঘাতের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির পাশাপাশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থনের বিষয়টিকেও সামগ্রিক আলোচনার শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত মিলেছে। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেন, অন্যান্য দেশের কাছে যদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকে, তবে ইরানকে নির্দিষ্ট কিছু সক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করা পুরোপুরি ন্যায্য নয়। মার্কিন প্রশাসনের এই মনোভাবের পর ইরানের প্রেসিডেন্টের এমন বক্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, তেহরান নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে সার্বভৌমত্বের প্রধান হাতিয়ার মনে করছে এবং এটি বাদ দিয়ে কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক আলোচনা কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন দেখার বিষয়।