আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ দিবসের একটি অনুষ্ঠানে দেশভাগ, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ সংক্রান্ত জটিলতার জন্য কংগ্রেস, বামপন্থী দল এবং তৃণমূল কংগ্রেসের তীব্র সমালোচনা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি অভিযোগ করেছেন, পূর্ববর্তী রাজনৈতিক দলগুলোর তোষণের রাজনীতির কারণে দশকের পর দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হতে দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (২০ জুন) পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার তারকেশ্বরে আয়োজিত পশ্চিমবঙ্গ দিবসের মূল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্যের রাজ্যপাল আরএন রবিসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
বক্তব্যে নরেন্দ্র মোদি ভারতের স্বাধীনতা ও দেশভাগের প্রেক্ষাপট স্মরণ করে বলেন, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্ব বাংলাকে চরম অবহেলায় ফেলে রেখেছিল। পরবর্তী সময়ে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস ভোটের রাজনীতির স্বার্থে ‘তোষণের নীতি’ অবলম্বন করেছে। তিনি মন্তব্য করেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীদের পবিত্র মাটিতে বিদেশি রাজনৈতিক বিচারধারা চাপিয়ে দিয়ে রাজ্যের ঐতিহ্যকে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও দাঙ্গার প্রসঙ্গ টেনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৪৬ সালের কলকাতা এবং নোয়াখালির ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় বহু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। দেশভাগের সেই চরম বেদনা ও ক্ষত সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ তার নিজস্ব স্বকীয়তা, সংস্কৃতি এবং বাঙালি পরিচয় অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ দিবস উদযাপনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে নরেন্দ্র মোদি বলেন, এই দিনটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়, এটি মূলত ইতিহাসকে পুনর্মূল্যায়ন ও স্মরণ করার দিন। দেশভাগের প্রাক্কালে যখন সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার একটি সুদূরপ্রসারী চেষ্টা চলছিল, তখন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সেই উদ্যোগের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন এবং ভারতের অংশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের আত্মপ্রকাশ নিশ্চিত করেছিলেন।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ প্রসঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পূর্ববর্তী রাজ্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি পূর্ববর্তী রাজ্য সরকার দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রেখেছিল। তবে রাজ্যে প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সেই স্থবির জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া পুনরায় গতিশীল হয়েছে এবং সীমান্ত সুরক্ষার কাজ এগিয়ে চলছে।
উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে পয়লা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষের দিনটিকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে উদযাপন করা হতো। তবে ভারতের কেন্দ্রীয় নীতি ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ২০ জুন দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৯৪৭ সালের ২০ জুন অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক আইনসভায় ঐতিহাসিক ভোটাভুটির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অংশ করার প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়েছিল, যার ফলে আজকের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি গঠিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, মোদির এই বক্তব্য আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।