আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বান্নু জেলায় একটি যাত্রীবাহী যান ও উদ্ধারকারীদের লক্ষ্য করে পরপর দুটি পৃথক বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। আকস্মিক এই জোড়া হামলায় অন্তত সাতজন নিহত এবং আরও তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় শনিবার (২০ জুন) জেলার মেরকা বেরা এলাকায় এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। হামলার পর পরই পুরো এলাকাটি কর্ডন করে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে পাকিস্তানের যৌথ নিরাপত্তা বাহিনী।
বান্নু জেলার জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা ইয়াসির আফ্রিদি সংবাদমাধ্যমকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটে সড়ক সংলগ্ন এলাকায় আগে থেকে পুঁতে রাখা একটি ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) বা বিস্ফোরকের মাধ্যমে। হাতি খেল গ্রাম থেকে বান্নু শহরের দিকে রওনা হওয়া একটি যাত্রীবাহী ভ্যান ওই সড়কটি অতিক্রম করার সময় দূরনিয়ন্ত্রিত এই বিস্ফোরণটি ঘটানো হয়। শক্তিশালী এই বিস্ফোরণে যাত্রীবাহী যানটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় এবং ঘটনাস্থলেই ভ্যানে থাকা পাঁচজন আরোহীর মৃত্যু হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রথম হামলার ঘটনার পরপরই আশপাশের লোকজন এবং উদ্ধারকারীরা দ্রুত হতাহতদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। উদ্ধার তৎপরতা চলাকালীন ঠিক একই স্থানে দ্বিতীয় দফায় আরও একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। দ্বিতীয় এই হামলায় ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজে নিয়োজিত থাকা দুই স্বেচ্ছাসেবী প্রাণ হারান। এ সময় সেখানে থাকা আরও একটি উদ্ধারকারী যানবাহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অন্তত তিনজন গুরুতর আহত হন। বিস্ফোরণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে আশেপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে।
ভয়াবহ এই হামলার পর স্থানীয় উদ্ধারকারী দল এবং পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে হতাহতদের উদ্ধার করে বান্নুর খলিফা গুল নওয়াজ টিচিং হাসপাতালে প্রেরণ করে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ জানিয়েছে, আহত তিনজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক, যার কারণে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিহতদের মরদেহ আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। ঘটনার পর পর জেলার সবকটি হাসপাতালে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত কোনও সশস্ত্র গোষ্ঠী বা সংগঠন এই জোড়া হামলার দায় স্বীকার করেনি। জেলা প্রশাসন ও কাউন্টার টেররিজম ডিপার্টমেন্ট (সিটিডি) যৌথভাবে এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ কর্মকর্তা ইয়াসির আফ্রিদি জানিয়েছেন, হামলাকারীদের শনাক্ত করতে এবং ব্যবহৃত বিস্ফোরকের ধরণ পরীক্ষা করতে ফরেনসিক দল ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য হামলাকারীদের খোঁজে আশপাশের পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর চিরুনি অভিযান চলছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বান্নু জেলাটি দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সহিংসতাপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। এর আগেও চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বান্নুতে সংঘটিত এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় তিন নারী ও এক শিশুসহ পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছিলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বেলুচিস্তান প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর এই ধরণের সশস্ত্র হামলা ও বোমাবাজির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আঞ্চলিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগস্ট মাসে প্রতিবেশী আফগানিস্তানে তালেবান পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পাকিস্তানের সীমান্ত সংলগ্ন এই অঞ্চলগুলোতে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলো এই অঞ্চলে তাদের শক্তিমত্তা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটিয়েছে, যা সমগ্র পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।