আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে ইসরায়েল ও লেবাননের প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন দফার দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। শুক্রবার (১৯ জুন) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, আগামী ২৩ ও ২৫ জুন এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে দুটি সার্বভৌম সরকার স্থায়ী শান্তি বজায় রাখার রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনা করবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এই বিবৃতির কিছু সময় আগেই ইসরায়েল ও লেবানন ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হয়। সম্প্রতি লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক অভিযানের কারণে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধ অবসানের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে নতুন দফার আলোচনাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সঙ্গে টেলিফোনে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ফোনালাপে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে লেবাননের দ্বিপক্ষীয় সফল আলোচনাই দেশটির যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘদিনের সহিংসতা অবসানের একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ। দুই নেতা আগামী সপ্তাহের নির্ধারিত আলোচনার এজেন্ডা নিয়েও মতবিনিময় করেন।
এর আগে, গত এপ্রিল মাসে দীর্ঘ তিন দশক পর ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে প্রথম দফার সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৩ সালের পর সেটিই ছিল দুই প্রতিবেশী দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রথম মুখোমুখি বৈঠক। এপ্রিলের ওই বৈঠক এবং জুন মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিত পরবর্তী দফার আলোচনার ধারাবাহিকতায় ইসরায়েল ও লেবানন সীমান্ত সংঘর্ষে বিরতি দিতে সম্মত হয়েছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি অর্জনের ক্ষেত্রে বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে লেবাননের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিজবুল্লাহর অবস্থান।
কূটনৈতিক এই প্রক্রিয়ায় হিজবুল্লাহকে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত না করায় আলোচনা থেকে দৃশ্যমান বা অর্থবহ অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মধ্যস্থতাকারীদের এই সীমাবদ্ধতার মাঝেই সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সীমান্ত জুড়ে পাল্টাপাল্টি রকেট ও বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। যার সর্বশেষ জেরে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন।
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকে লেবানন সরকার মার্কিন-সমর্থিত একটি বিশেষ রোডম্যাপের অধীনে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার এবং তাদের সামরিক সক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, লেবাননের বৈরুত সরকারও দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকা থেকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে চলতি জুন মাসে দুই দেশের মধ্যে হওয়া একটি চুক্তিতে হিজবুল্লাহকে দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদীর উত্তর পাড়ে সরে যাওয়ার শর্ত দেওয়া হলেও, সেখানে ইসরায়েলি সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহারের বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করা হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যে কৌশলগত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাতে লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে চলমান সামরিক সংঘাত ও সীমান্ত উত্তেজনা সেই বৈশ্বিক সমঝোতা বাস্তবায়নের পথে বারবার বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও বিরলভাবে ইসরায়েলের সামরিক ভূমিকার সমালোচনা করতে দেখা গেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল আঞ্চলিক কূটনীতিকে উপেক্ষা করে মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধের পরিবেশ বজায় রাখতে চাইছে। এই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠেয় আগামী সপ্তাহের দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শান্তি প্রক্রিয়ার গতিপথ নির্ধারণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।