আইন আদালত ডেস্ক
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মিজোরামের একটি জেলা আদালত দীর্ঘ ৯ বছর পর এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন। মিজোরামের এক আদিবাসী তরুণীকে গণধর্ষণ ও মুখে অ্যাসিড নিক্ষেপের অপরাধে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) দুই সদস্যকে ৪২ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার মিজোরামের বিশেষ জেলা আদালতের বিচারক সিলভি জোমুয়ানপুই এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেন। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন বাঙালি এবং অন্যজন ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের বাসিন্দা। আদালত অপরাধীদের কারাদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ডও প্রদান করেছেন।
মামলার বিবরণ এবং তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১৬ জুলাই মিজোরামের একটি সুপুরি বাগানে এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। বিএসএফের ওই দুই সদস্য স্থানীয় এক আদিবাসী তরুণীকে জোরপূর্বক সুপুরি বনে তুলে নিয়ে গিয়ে পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করে। পাশবিক নির্যাতনের পর অপরাধ ঢাকতে এবং তরুণীর পরিচয় মুছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তার মুখে অ্যাসিড ঢেলে দেওয়া হয়। এই ভয়াবহ অ্যাসিড হামলার কারণে ভুক্তভোগী তরুণীর একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায় এবং তার মুখের ত্বক মারাত্মকভাবে ঝলসে যায়। ঘটনার সময় নির্যাতিতার সঙ্গে তার এক বান্ধবী উপস্থিত ছিলেন, যিনি ঘটনার কয়েক দিন পর রহস্যজনকভাবে মারা যান। তবে পর্যাপ্ত ও প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাবে আদালত ওই বান্ধবীর মৃত্যুর ঘটনায় বিএসএফ সদস্যদের দোষী সাব্যস্ত করতে পারেননি।
নৃশংস এই ঘটনার পর ২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জেলা শাসকের উপস্থিতিতে ভুক্তভোগী তরুণী অভিযুক্ত দুই বিএসএফ সদস্যকে শনাক্ত করেন। এরপর আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালত স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী এবং চিকিৎসকদের সহ মোট ১৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন করেন। দীর্ঘ শুনানি এবং সংগৃহীত ডাক্তারি পরীক্ষা ও পারিপার্শ্বিক তথ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাই শেষে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগের সত্যতা পান।
বিচারকের প্রদত্ত রায় অনুযায়ী, আসামিদের তিনটি পৃথক ধারায় এই সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গণধর্ষণের অপরাধে ২০ বছর, ধর্ষণের মাধ্যমে গুরুতর শারীরিক জখম ও অঙ্গহানি করার অপরাধে ১০ বছর এবং অ্যাসিড হামলার দায়ে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আইনগত নিয়ম অনুযায়ী তিনটি অপরাধের সাজা যুগপৎভাবে অর্থাৎ একই সঙ্গে কার্যকর হবে, যার ফলে আসামিদের সর্বমোট ৪২ বছর কারাগারে কাটাতে হবে। এছাড়া প্রতিটি অপরাধের জন্য আসামিদের ৬০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ অনাদায়ে তাদের আরও অতিরিক্ত ২ মাস করে কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন।
আইনজীবী এবং মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মতো একটি শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে বেসামরিক আদালতে এই ধরনের কঠোর শাস্তি প্রদানের রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই রায় সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে এটি অপরাধীদের জন্য একটি কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে, যা ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের নারীদের নিরাপত্তা ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় করবে।