আইন আদালত ডেস্ক
ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত ইসলামী ছাত্রশিবিরের বহিষ্কৃত এক নেতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ায় কুমিল্লার দুই সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটরকে (এপিপি) পদচ্যুত করেছে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর অনুবিভাগের এক অফিস আদেশে কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মনির হোসেন পাটোয়ারী এবং অ্যাডভোকেট সাইদুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করা হয়। সলিসিটর অনুবিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব (জিপি-পিপি) মো. ফারুক হোসাইন স্বাক্ষরিত এই আদেশটি অবিলম্বে কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ জুন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও কুমিল্লা পশ্চিম অঞ্চলের সাবেক সভাপতি জিসান মিয়া প্রধান নিখোঁজ হয়েছেন মর্মে তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাউদকান্দি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পরদিন জেলা পুলিশের একটি দল লাকসাম রেলওয়ে জংশন এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।
পরবর্তী সময়ে জেলা পুলিশ সুপার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, নিখোঁজের ঘটনাটি মূলত একটি পরিকল্পিত নাটক ছিল। ২৫ বছর বয়সী এক বিধবা নারী জিসান মিয়ার বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ ও জোরপূর্বক ভ্রূণ নষ্ট করার অভিযোগে দাউদকান্দি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে জিসান ওই নারীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং গত ২০ মে দাউদকান্দির একটি ভাড়া বাসায় তাকে ধর্ষণ করেন। পরবর্তীতে ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে জিসান ও তার সহযোগীরা জোরপূর্বক গর্ভপাত ঘটান। গত ১২ জুন তাদের বিয়ের কথা থাকলেও আইনি দায়বদ্ধতা ও বিয়ে এড়াতে জিসান এই নিখোঁজের নাটক সাজান বলে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে।
গত ১৬ জুন আদালতের নির্দেশে আসামি জিসান মিয়া প্রধানকে কারাগারে পাঠানো হয়। এই মামলার শুনানির পর অভিযুক্ত দুই সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর আদালতের সামনে আসামির পক্ষে অবস্থান নিয়ে গণমাধ্যমের কাছে বক্তব্য বা ব্রিফিং প্রদান করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের নিয়োজিত আইনজীবী হয়েও ফৌজদারি মামলার আসামির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি দেশের প্রচলিত আইনি ও পেশাগত নীতিমালার পরিপন্থী। কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিংকু মন্ত্রণালয়ের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সরকারি আইনজীবী হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের বেতনভুক্ত হয়ে আসামির পক্ষে সাফাই গাওয়া বা গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়া সম্পূর্ণ আচরণবিধি লঙ্ঘন।
এদিকে কুমিল্লা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট বদিউল আলম সুজন জানান, বরখাস্ত হওয়া দুই আইনজীবী সরাসরি আসামির পক্ষে ওকালতনামা দাখিল না করলেও আদালতের বাইরে আসামির পক্ষে সাফাই গেয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন, যা দৃশ্যত পেশাগত অসদাচরণের শামিল। আইন মন্ত্রণালয় তাদের প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে এই নিয়োগ বাতিল করেছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পেশাগত দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের একটি কঠোর বার্তা দেওয়া হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞরা।