আইন আদালত ডেস্ক
চট্টগ্রামের বন্দরনগরীতে পাঁচ বছর বয়সী শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতকে অপহরণের পর হত্যা এবং মরদেহ টুকরো করে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় একমাত্র আসামি আবীর আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে আসামিকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১৭ জুন) চট্টগ্রামের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মুহাম্মদ আলী আক্কাস চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আবীর আলী আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে কঠোর নিরাপত্তায় কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার বিবরণ ও তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর চট্টগ্রামের ইপিজেড থানার নয়ারহাট ওয়াছমুন্সী বাড়ি এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানার পাঁচ বছর বয়সী কন্যাসন্তান আলিনা ইসলাম আয়াত নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের পর পরিবারের পক্ষ থেকে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলে তদন্তে নামে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তের একপর্যায়ে পিবিআই আয়াতদের সাবেক ভাড়াটিয়া ও প্রতিবেশী আবীর আলীকে গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদে আবীর স্বীকার করেন যে, মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে আয়াতকে অপহরণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে মরদেহ ছয়টি টুকরো করে কাট্টলী এলাকার সাগর উপকূলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিট দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পিবিআই পরিদর্শক মনোজ কুমার দে তদন্ত শেষে আবীর আলীকে একমাত্র আসামি করে এই প্রতিবেদন জমা দেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেন আদালত।
রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি জালাল উদ্দিন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, রাষ্ট্রপক্ষ আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। মামলাটিতে মোট ৩৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন করা হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের পর আদালত এই চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেন, এই হত্যাকাণ্ডটি ছিল সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত, নিষ্ঠুর, নৃশংস এবং নির্মম। একটি অবুঝ শিশুকে যেভাবে হত্যা করে মরদেহ টুকরো করা হয়েছে, তা সুসভ্য সমাজে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। অপরাধের তীব্রতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে আদালত আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন।
এই রায়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিচার পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা জানান, শিশু সুরক্ষা এবং সামাজিক অপরাধ দমনে এ ধরনের দৃষ্টান্তমূলক রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রায় কার্যকর করার জন্য আইনি পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।