আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার প্রাক্কালে মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এলাকা থেকে ইরানের একাধিক তেলবাহী জাহাজ বের হয়ে গেছে। এর পর পরই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি বিষয়ক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো পুরোপুরি অনিশ্চয়তা কাটেনি।
তেল পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ট্যাংকারট্র্যাকার্স’ নিশ্চিত করেছে যে, গত দুই মাসের মধ্যে এই প্রথম ইরান পুনরায় অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরু করেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ইরানের দুটি বিশাল তেলবাহী জাহাজ—’ডিওনা’ এবং ‘হিরো-২’ মার্কিন নৌ অবরোধ এলাকা থেকে মুক্ত হয়েছে। এই দুটি জাহাজে প্রায় ৩৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত ইরানি তেল রয়েছে। পরবর্তীতে আরও একটি তেলবাহী জাহাজ ওই এলাকা ত্যাগ করেছে বলে জানা গেছে। এই ঘটনাকে দুই দেশের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা হ্রাসের একটি বড় লক্ষণ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক পাহাড়ি রিসোর্টে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই বৈঠকের পর আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও দেশটির ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে বিস্তারিত রূপরেখা চূড়ান্ত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সূত্র দাবি করেছে, ইতোমধ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তির কাঠামো ইলেকট্রনিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই কাঠামোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি এবং প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্বাক্ষর করেছেন বলে জানা গেছে।
সম্ভাব্য এই চুক্তির শর্তানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ইরানকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও জ্বালানি বিক্রির অনুমতি দিতে পারে। পাশাপাশি ইরানের তেল খাতের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হতে পারে, যা দেশটির ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক পরিবহন এবং বিমা সেবার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই কূটনৈতিক অগ্রগতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। বুধবার বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৮.৭৪ ডলারে নেমে এসেছে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামও হ্রাস পেয়ে ৭৫.৮৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে এই শান্তি আলোচনার পথ এখনো পুরোপুরি মসৃণ নয়। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের নতুন করে চালানো সামরিক হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইরান এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যা আসন্ন শান্তি আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও রক্ষণশীল রাজনীতিকরা এই সম্ভাব্য চুক্তির বিরোধিতা করছেন এবং এর বিস্তারিত শর্তাবলী প্রকাশের দাবি জানাচ্ছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার থেকে নতুন দফার আলোচনা শুরু হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করলেও অতীতে চুক্তি ভঙ্গের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।