আন্তর্জাতিক ডেস্ক
চলমান কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক কাঠামোগত সমঝোতা অর্জিত হয়েছে। এই সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরানে ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে ইরানকে সরাসরি অনুদান বা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার যে তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে, তা নাকচ করে দিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, এটি কোনো সরকারি আর্থিক সহায়তা বা অনুদান নয়, বরং নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে ইরানে বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগের একটি সুযোগ মাত্র।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই তহবিলের প্রকৃত রূপরেখা ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, ইরান যদি দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক চুক্তির শর্তাবলি যথাযথভাবে মেনে চলে, তবে দেশটির ওপর আরোপিত বিদ্যমান মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আংশিকভাবে শিথিল করা হতে পারে। নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ইরানে আইনি প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগের সুযোগ পাবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, যদি সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো কোনো দেশ ইরানে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগ করতে চায়, তবে বর্তমান নিষেধাজ্ঞার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। নতুন কাঠামোর অধীনে ইরান তার আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন আনলে যুক্তরাষ্ট্র সেই বিনিয়োগের পথ সুগম করে দেবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের এই তহবিলের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক কোম্পানির পক্ষ থেকে আংশিকভাবে প্রতিশ্রুত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, পারস্য উপসাগরীয় দেশসমূহ, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি ইরানে বিনিয়োগের বিষয়ে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই বিশাল তহবিল মূলত ইরানের জ্বালানি খাত, গণপরিবহন, উৎপাদন শিল্প, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে দেশটির মোবারাকেহ স্টিল কমপ্লেক্স, প্রধান তেল শোধনাগারসমূহ এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আধুনিকায়নে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং উভয় পক্ষকে একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে উৎসাহিত করাই এই তহবিলের মূল লক্ষ্য। তবে একটি আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত এই তহবিল কার্যকর বা কোনো ধরনের বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরু হবে না। প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে নির্দিষ্ট প্রকল্পগুলো চিহ্নিতকরণ ও চূড়ান্ত পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান প্রাথমিক আলোচনায় যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দাবি করেছিল। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন কোনো রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সরাসরি অর্থ প্রদানে অস্বীকৃতি জানালে, এই বেসরকারি বিনিয়োগভিত্তিক বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামোটি মধ্যস্থতার উপায় হিসেবে সামনে আসে। দীর্ঘকাল ধরে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকায় ইরান বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। অথচ ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এই দেশটিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস এবং চতুর্থ বৃহত্তম খনিজ তেলের মজুদ রয়েছে। একই সাথে ৯ কোটিরও বেশি কর্মক্ষম ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী এবং শক্তিশালী শিল্প সম্ভাবনা থাকায়, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও বিদেশি বিনিয়োগের এই উদ্যোগ কার্যকর হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি সামগ্রিক বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।