আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক অবরোধের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে একটি আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তিতে উপনীত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। দ্বিপাক্ষিক এই সমঝোতার অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে এবং জলপথটিতে আরোপিত সমস্ত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে। আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে।
সোমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঐতিহাসিক চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। হরমুজ প্রণালীর শুল্কমুক্ত বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার পাশাপাশি সেখান থেকে সমস্ত মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেওয়ার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক রূপ লাভ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান এই দীর্ঘ সংলাপে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। সোমবার ভোররাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, যুদ্ধ ও বৈরিতা নিরসনে উভয় দেশ একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছেছে। এই চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সবকটি যুদ্ধসম্মুখে তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে দুই পক্ষই। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এই চুক্তিকে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
এদিকে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বিবৃতি জারি করা না হলেও দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো চুক্তির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতির সূত্র উল্লেখ করে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার খবরটি নিশ্চিত করেছে।
ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরকে সংযুক্তকারী হরমুজ প্রণালীকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান কৌশলগত জলপথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্ববাজারে সরবরাহকৃত মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। বিগত কয়েক বছর ধরে এই অঞ্চলে পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছিল। দফায় দফায় অবরোধ আরোপের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে লেবানন ও সিরিয়াসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের চলমান প্রক্সি যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটতে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচল শুরু হলে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য স্থিতিশীল হবে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে এই উন্মুক্ত বাণিজ্য পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় আগামী শুক্রবারের আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের দিকে এখন তাকিয়ে আছে বিশ্ব সম্প্রদায়।