আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের আটকে রাখা ইরানের ২ হাজার ৪০০ কোটি (২৪ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ সম্পদ অবমুক্ত করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন বলে দাবি করেছে তেহরান। তবে অভ্যন্তরীণ কৌশলগত কারণে মার্কিন প্রশাসন বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা থেকে বিরত রয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মহসেন রেজাইয়ের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, তখনই এই অর্থ ছাড়ের বিষয়টি সামনে এলো।
ইরানের নীতি নির্ধারণী পরিষদের সদস্য ও সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার জেনারেল মহসেন রেজাই দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর দেজফুলে আয়োজিত এক স্মরণসভায় দেওয়া বক্তব্যে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের পর বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ইরানের কৌশলগত অবস্থান আরও সুসংহত হয়েছে। প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণেই মার্কিন প্রশাসন তেহরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণে ইসরায়েলি লবির প্রভাব প্রবল হওয়ার কারণে তারা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছে। তবে দীর্ঘ অচলাবস্থার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত ইরানের জব্দকৃত অর্থ ছাড়ের শর্তটি মেনে নিয়েছেন, যদিও রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে ওয়াশিংটন তা প্রকাশ্যে স্বীকার করতে চাইছে না।
এই বক্তব্যের ঠিক আগের দিন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি খসড়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সবকটি যুদ্ধক্ষেত্রে চলমান সামরিক সংঘাতের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটবে। আরাগচি উল্লেখ করেন, ডিজিটাল বা দূরবর্তী উপায়ে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে, যা পরবর্তীতে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণের পথ প্রশস্ত করবে। তবে তেহরানের অভ্যন্তরে কট্টরপন্থী শিবিরের পক্ষ থেকে এই খসড়া চুক্তি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হচ্ছে এবং একে একটি বড় ধরনের ছাড় হিসেবে দেখছেন অনেকে।
অন্য দিকে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বিষয়টি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। হোয়াইট হাউজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে তারা আশাবাদী। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই চুক্তি কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক লেনদেনের বিষয় নয়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চুক্তি সই কিংবা বৈঠকে বসার শর্ত হিসেবে কোনো অর্থ ছাড় দেওয়া হবে না। মার্কিন পরিকল্পনা অনুযায়ী, চুক্তিটি হবে সম্পূর্ণ ‘পারফরম্যান্স-ভিত্তিক’। অর্থাৎ, ইরানকে প্রথমে তার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে, দেশটিতে থাকা উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের উপস্থিতিতে ধ্বংস বা অপসারণ করতে হবে এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে। এই শর্তগুলো বাস্তবায়নের পর ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জব্দকৃত অর্থ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য মূলত নিজ নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জনমতকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল। ইরান যেখানে এই চুক্তিকে তাদের কূটনৈতিক ও সামরিক বিজয় এবং অর্থনৈতিক অধিকার আদায় হিসেবে দেখাতে চাইছে, সেখানে ট্রাম্প প্রশাসন একে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা দমনের একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে প্রচার করছে। তবে শেষ পর্যন্ত এই সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়িত হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে, বিশেষ করে তেল বাজারে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।