আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান তিন মাসব্যাপী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে আলোচিত একটি সমঝোতা স্মারক বা শান্তিচুক্তি আজ রোববার সই হওয়ার কথা রয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ওয়াশিংটন আজই চুক্তি সইয়ের বিষয়ে চূড়ান্ত আশাবাদ ব্যক্ত করলেও এর সময়সূচি নিয়ে ভিন্ন বার্তা দিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্টভাবে আজ রোববার চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে আগামী দিনগুলোতে চূড়ান্ত সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চলমান অস্থিরতা নিরসনে এই সম্ভাব্য চুক্তিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
মূল মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়ে প্রবল ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে এবং আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এটি বৈদ্যুতিন বা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সই হতে পারে। এই প্রাথমিক চুক্তির পর আগামী সপ্তাহ থেকে দুই দেশের মধ্যে কারিগরি ও নীতিগত পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে চুক্তির কার্যকারিতা ও এর সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি নিয়ে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের শীর্ষ পর্যায়ে এখনো কিছু কৌশলগত মতপার্থক্য দৃশ্যমান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, এই চুক্তি সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ও পারমাণবিক উপাদানগুলো একটি উপযুক্ত সময়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার বিষয়ে ইঙ্গিত দেন। ট্রাম্প সতর্ক করে আরও বলেন, যদি এই শান্তি প্রক্রিয়া দ্রুত ও মসৃণভাবে সম্পন্ন না হয়, তবে ওয়াশিংটনের কাছে ‘চূড়ান্ত বিকল্প’ ব্যবস্থা রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ এনে আসলেও তেহরান বরাবরই একে শান্তিপূর্ণ গবেষণা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনমুখী কর্মসূচি বলে দাবি করে আসছে।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই চুক্তি সইয়ের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, চুক্তিটি আজ রোববার সই হচ্ছে না, তবে আগামী দিনগুলোতে তা সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দেশটির রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো এই সমঝোতার বিরোধিতা করে দাবি করছে, চুক্তির শর্তগুলো ইরানের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী এবং এর ফলে হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হতে পারে।
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখা নিয়ে কথা বলেন। তাঁর ভাষ্যমতে, এই চুক্তির আওতায় লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতের অবসান ঘটবে, হরমুজ প্রণালি পুনরুন্মুক্ত হবে এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হবে। আরাগচি আরও উল্লেখ করেন যে, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বেসামরিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, তবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সেখানে সেবা প্রদানের বিপরীতে নির্দিষ্ট মাশুল আদায় করার অধিকার তেহরানের থাকবে। তবে মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানকে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা বা জব্দকৃত ২৪ বিলিয়ন ডলারের তহবিল ফেরত পেতে হলে চুক্তির পারমাণবিক শর্তগুলো পুরোপুরি পূরণ করতে হবে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী কর্তৃক ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলার মাধ্যমে এই বিধ্বংসী যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানও ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খায়। গত এপ্রিল মাসে উভয় পক্ষ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও গত এক সপ্তাহে অন্তত দুই দফা পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। ফলে এই সংকটের স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান এবং বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে আজ রোববার বা আগামী দিনগুলোতে স্বাক্ষরিত হতে যাওয়া এই শান্তিচুক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।