আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিতব্য শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আগামী বুধবার (১৭ জুন) এই দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে পৃথকভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কার্যালয় হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। চলমান আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও কৌশলগত সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা সংকটের প্রেক্ষাপটে এই বৈঠককে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
হোয়াইট হাউজের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তার সূত্রানুসারে, জি-৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়া মিত্র দেশগুলোর নেতাদের সাথে ট্রাম্প প্রধানত হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও সেখানে সৃষ্ট সংকট নিরসনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করবেন। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে পাতা মাইন অপসারণ এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে মিত্র দেশগুলোর সহযোগিতা চাইবে ওয়াশিংটন। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স ইতোমধ্যে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়ে জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে চলমান সংঘাত সাময়িকভাবে বন্ধ হলে তারা হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা জোরদারে সরাসরি সহায়তা করতে আগ্রহী।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সাথে মার্কিন প্রশাসনের চলমান উত্তেজনা নিরসনে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতার আভাস পাওয়া গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে একটি বিশেষ সমঝোতার বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। এই সমঝোতাটি চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ নিলে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক উত্তেজনার অবসান ঘটতে পারে। চুক্তি সম্পন্ন হলে হরমুজ প্রণালি আবারও পুরোপুরি বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত এই নৌপথে মার্কিন নৌ অবরোধ ও কঠোর নজরদারি বহাল থাকবে বলে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে।
এর আগে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা, বিশেষ করে খারগ দ্বীপে পূর্বপরিকল্পিত সামরিক হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দেয় ওয়াশিংটন। উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রেক্ষিতেই এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি ও হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে সমন্বয় সাধনের জন্য মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য হরমুজ প্রণালি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত পথ। বৈশ্বিক মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য সংঘাত বা অচলাবস্থা তৈরি হলেই বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয় এবং তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বর্তমান সংকটের কারণেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে।
অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ জ্বালানির এই বাড়তি খরচের বোঝা সরাসরি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে বাধ্য হলেও, ভারত দীর্ঘ সময় ধরে তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্যানুসারে, হরমুজ প্রণালি সংকটের প্রথম ৭৬ দিন পর্যন্ত বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে একমাত্র ভারতই অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের দাম বাড়তে দেয়নি। এমতাবস্থায়, ট্রাম্প-মোদি বৈঠকে জ্বালানি নিরাপত্তা, ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়গুলো প্রধান্য পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।