আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ইরানে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগসংবলিত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যস্থতা বা সহায়তায় ইরানে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার পাঠানোর যে দাবি সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে দেশটির সরকার। এই বিষয়ে দুবাই ও আবুধাবির পক্ষ থেকে কড়া অবস্থান নিয়ে বলা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক আর্থিক বিধিমালা ও নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত নিয়মনীতি মেনে চলতে দেশটি সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পটভূমিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত তার আগের কঠোর নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। চারজন অজ্ঞাত কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান উত্তেজনার মাঝে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের জন্য শত শত কোটি ডলারের আর্থিক সুবিধা দিতে সম্মত হয়েছে। সেখানে আরও উল্লেখ করা হয় যে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের তেল বিক্রির শত শত কোটি ডলার ছাড় বা মুক্ত করার একটি প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
তবে এসব প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পরপরই তার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ ও খণ্ডন করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে এই ধরনের দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করা হয়েছে। আবুধাবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ধরনের কোনো লেনদেন বা তহবিল স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেনি এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে ইরানকে কোনো আর্থিক সুবিধা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
ইউএই-এর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইরানের কোনো জব্দকৃত বা অবরুদ্ধ তহবিল মুক্ত, স্থানান্তর কিংবা এ ধরনের কোনো লেনদেন করা হয়নি। এই ধরনের দাবির কোনো বাস্তব বা আইনি ভিত্তি নেই।’ মন্ত্রণালয় আরও জানায়, বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আইনি কাঠামোর প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল এবং যেকোনো ধরনের বেআইনি আর্থিক কার্যক্রম প্রতিরোধে দেশটির কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশ্ব গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমগুলোকে যেকোনো স্পর্শকাতর খবর প্রকাশের আগে সঠিক তথ্য যাচাই করার জোর আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো ধরনের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা যাচাই ছাড়া ভিত্তিহীন খবর প্রচার করা থেকে বিরত থাকার জন্য সংবাদ সংস্থাগুলোকে অনুরোধ করেছে দেশটির সরকার, কারণ এই ধরনের প্রতিবেদন মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক কূটনৈতিক পরিবেশ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন রয়েছে, তার মধ্যে এই ধরনের সংবাদ বেশ গুরুত্ব বহন করে। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে আটকে রয়েছে। এই অবস্থায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রের নাম জড়িয়ে এমন প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বেশ আলোড়ন তৈরি করেছে। তবে ইউএই সরকারের দ্রুত এবং দৃঢ় প্রত্যাখ্যানের ফলে এই বিষয়ে তৈরি হওয়া সাময়িক ধোঁয়াশা কেটে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষই আন্তর্জাতিক আর্থিক নিয়ম অমান্য করে নতুন কোনো বিতর্কে জড়াতে আগ্রহী নয়।