অর্থনীতি প্রতিবেদক
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই নতুন পে স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দেন। আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে এই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে। নতুন এই কাঠামোতে বিভিন্ন গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মূল বেতন বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ থেকে আড়াইগুণ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের প্রায় ১৫ লাখের বেশি সরকারি চাকরিজীবী প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, সরকারি কর্মচারীরা গত প্রায় ১১ বছর ধরে ২০১৫ সালে ঘোষিত অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোর আওতায় বেতন-ভাতা পেয়ে আসছেন। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও বাস্তবতার বিষয়টি বিবেচনা করে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামোগত বৈষম্য কমিয়ে সমতাভিত্তিক সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার বহুমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে এবং এই নতুন কাঠামো তারই একটি অংশ।
প্রস্তাবিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামোর রূপরেখা অনুযায়ী, সরকারের সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন অর্ধেকেরও বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে কার্যকর থাকা অষ্টম জাতীয় বেতনকাঠামোতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা। নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, নতুন কাঠামোতে সর্বনিম্ন মূল বেতন (গ্রেড-২০) ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন (গ্রেড-১) ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামোর বিস্তারিত প্রস্তাবনা অনুযায়ী, উচ্চতর গ্রেডগুলোর মধ্যে গ্রেড-১-এর মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, গ্রেড-২-এর বেতন ৬৬ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা, গ্রেড-৩-এর বেতন ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১ লাখ ⚖১৩ হাজার টাকা এবং গ্রেড-৪-এর বেতন ৫০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। মধ্যম সারির পদগুলোর মধ্যে গ্রেড-৫-এর বেতন ৪৩ হাজার টাকা থেকে ৮৬ হাজার টাকা, গ্রেড-৬-এর বেতন ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৭১ হাজার টাকা, গ্রেড-৭-এর বেতন ২৯ হাজার টাকা থেকে ৫৮ হাজার টাকা, গ্রেড-৮-এর বেতন ২৩ হাজার টাকা থেকে ৪৭ হাজার ২ শত টাকা এবং প্রথম শ্রেণীর প্রারম্ভিক পদ অর্থাৎ গ্রেড-৯-এর বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৫ হাজার ১০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে অন্যান্য গ্রেডের ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ রয়েছে। এর মধ্যে গ্রেড-১০-এর বেতন ১৬ হাজার টাকা থেকে ৩২ হাজার টাকা, গ্রেড-১১-এর বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা, গ্রেড-১২-এর বেতন ১১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা, গ্রেড-১৩-এর বেতন ১১ হাজার টাকা থেকে ২৪ হাজার টাকা এবং গ্রেড-১৪-এর বেতন ১০ হাজার ২০০ টাকা থেকে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। নিম্নতর গ্রেডগুলোর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে গ্রেড-১৫-এর বেতন ৯ হাজার ৭০০ টাকা থেকে ২২ হাজার ৮০০ টাকা, গ্রেড-১৬-এর বেতন ৯ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ২১ হাজার ৯০০ টাকা, গ্রেড-১৭-এর বেতন ৯ হাজার টাকা থেকে ২১ হাজার ৪০০ টাকা, গ্রেড-১৮-এর বেতন ৮ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ২১ হাজার টাকা, গ্রেড-১৯-এর বেতন ৮ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২০ হাজার ৫০০ টাকা এবং সর্বশেষ গ্রেড-২০-এর বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নবম জাতীয় বেতন কমিশনের এই সুপারিশগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও রাজস্ব আয়ের বিষয়টি বিবেচনা করে তিন ধাপে এই নতুন বেতনকাঠামো সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। কমিশনের প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী, নতুন এই বেতন স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে, যা জাতীয় বাজেটের ওপর একটি বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। তবে সরকার ক্রমান্বয়ে এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই চাপ সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। এ ছাড়া সরকারের শীর্ষ পর্যায় তথা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বিবেচনায় পৃথক একটি বিশেষ ধাপ (স্টেপ) তৈরি করবে অর্থ বিভাগ, যা পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন এই বেতন কাঠামো সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সাহায্য করলেও, এর ফলে বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এই অতিরিক্ত অর্থ বাজারে আসার সাথে সাথে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন হবে। একই সাথে, সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করাও এই বিশাল ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে।