আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের অফিশিয়াল পোর্ট্রেট প্রকাশের পর ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র হাইতির ফুটবল দলের বিশ্বকাপ জার্সি পরিবর্তনের বিষয়টি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পূর্বে উন্মোচিত হওয়া আকর্ষণীয় ও ঐতিহাসিক নকশার জার্সির পরিবর্তে দলটির খেলোয়াড়দের গায়ে সম্পূর্ণ সাধারণ একটি নীল জার্সি দেখা যাওয়ায় এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA) জার্সিতে থাকা ঐতিহাসিক কিছু উপাদানের ওপর আপত্তি তোলায় শেষ মুহূর্তে হাইতি ফুটবল ফেডারেশনকে এই পরিবর্তন আনতে হয়েছে।
হাইতির পূর্ববর্তী জার্সিতে দেশটির ইতিহাস ও বিপ্লবের এক অনন্য চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। সেখানে জঁ জ্যাক দেসালিনের নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রাম, ১৮০৩ সালের ঐতিহাসিক ভের্তিয়েরেসের যুদ্ধ এবং লাল-নীল রঙের ছিন্নভিন্ন পতাকার প্রতীকী উপস্থাপন করা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নকশা ব্যাপক প্রশংসা পায় এবং বাণিজ্যিক বিপণন শুরুর পরপরই জার্সিটির প্রথম চালান সম্পূর্ণ বিক্রি হয়ে যায়। তবে ফিফার আপত্তির মুখে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে এই জার্সি ব্যবহারের অনুমতি মেলেনি।
ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘সায়েতা’ এক বিবৃতিতে জানায়, ফিফা জার্সিটির কিছু নির্দিষ্ট ভিজ্যুয়াল উপাদান নিয়ে আনুষ্ঠানিক আপত্তি উত্থাপন করেছে। সংস্থাটির নীতি অনুযায়ী, নকশার ওই অংশগুলো রাজনৈতিক বা ভিন্ন কোনো অর্থে ব্যাখ্যা করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। ফিফার অফিশিয়াল বিধিমালা অনুযায়ী, খেলোয়াড়দের জার্সি কিংবা কোনো ক্রীড়াসরঞ্জামে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত কোনো বার্তা প্রদর্শন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই নিয়মের কঠোর ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের কারণেই হাইতির ঐতিহাসিক নকশাসমৃদ্ধ জার্সিটি পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
ফিফার এই সিদ্ধান্ত ফুটবল অঙ্গন এবং ইতিহাসবিদদের মধ্যে তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। হাইতি ফুটবল ফেডারেশনের (FHF) একজন মুখপাত্র জানান, ভুল ব্যাখ্যার কারণে স্বাধীনতার এই ঐতিহাসিক প্রতীকটি জার্সি থেকে সরিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে। ফেডারেশনের দাবি, এই নকশাটি কোনো সমসাময়িক রাজনৈতিক বার্তা ছিল না, বরং এটি ছিল হাইতির জাতীয় স্বাধীনতার ইতিহাস ও আত্মত্যাগের স্মারক।
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ মারলেন ডটও ফিফার এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভের্তিয়েরেসের যুদ্ধ হাইতির স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, যা বিশ্ব ইতিহাসে একমাত্র সফল ক্রীতদাস বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত। এমন একটি গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক উপাদানকে রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দুঃখজনক। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ফিফার এই কঠোর নীতি সবসময় সব দেশের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রয়োগ হয় না, কারণ অনেক দেশের প্রতীকেই রাজনৈতিক ইতিহাসের উপাদান বিদ্যমান থাকে।
তবে এই নিষেধাজ্ঞা ও বিতর্ক বিশ্বমঞ্চে হাইতির ইতিহাসকে নতুনভাবে পরিচিত করার ক্ষেত্রে উল্টো ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। জার্সিটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাইতির বিপ্লব, দাসপ্রথাবিরোধী সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন করে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।