আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর খেলা শুরুর প্রাক্কালে মেক্সিকোর সীমান্ত শহর তিহুয়ানায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে অনুশীলনরত ইরান ফুটবল দলের বেস ক্যাম্পের কাছে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পর টুর্নামেন্টে অংশ নিতে যাওয়া দলটির সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মেক্সিকান আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসন ইতিমধ্যেই এই ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করেছে এবং দলটির নিরাপত্তা জোরদার করেছে।
স্থানীয় পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, ইরান ফুটবল দল বর্তমানে তিহুয়ানা শহরের একটি আবাসিক হোটেলে অবস্থান করছে। হোটেলটির অদূরে অবস্থিত কালিয়েন্তে স্টেডিয়ামে দলটির নিয়মিত অনুশীলন সেশন চলছে। গত সপ্তাহে ওই স্টেডিয়ামের ঠিক বিপরীত পাশে অবস্থিত একটি সুপারমার্কেটের পার্কিং লটে পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়ি থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে এবং সন্দেহভাজন গাড়িটির ট্রাঙ্ক খুলে কালো প্লাস্টিকের ব্যাগে মোড়ানো অবস্থায় এক ব্যক্তির পচনশীল মরদেহ উদ্ধার করে।
প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃত মরদেহে স্পষ্ট আঘাত ও সহিংসতার চিহ্ন রয়েছে। অপরাধীদের শনাক্তকরণ এড়াতে এবং আলামত নষ্ট করতে গাড়িটি বেশ কয়েকদিন আগেই ওই জনাকীর্ণ পার্কিং লটে ফেলে রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনার পর পরই স্থানীয় ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে এবং মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য স্থানীয় হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে। এই ঘটনার পরপরই যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ইরান দলকে স্টেডিয়াম থেকে হোটেলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে ইরান দলের মেক্সিকোয় এই ক্যাম্পটি এমনিতেই বেশ স্পর্শকাতর ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের চলমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণে দলটি প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের প্রাক-বিশ্বকাপ ক্যাম্প করার পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হয়। শেষ মুহূর্তে বিকল্প হিসেবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী মেক্সিকোর এই শহরটিকে বেছে নেয়। তবে মেক্সিকোতে পৌঁছানোর পরপরই এমন একটি সহিংস অপরাধের ঘটনা ঘটায় খেলোয়াড় ও অফিশিয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মেক্সিকোর এই সীমান্তবর্তী শহরটি দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক মাদক কার্টেল, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের আধিপত্য এবং অভ্যন্তরীণ সহিংসতার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরেই এই অঞ্চলটিতে এক হাজারের বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা এখানকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থাকে নির্দেশ করে। বৈশ্বিক ক্রীড়া আসরের মতো বড় ইভেন্টের সময় এই ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মহলে আয়োজক দেশের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
উদ্ভূত পরিস্থিতির পর মেক্সিকান ফেডারেল পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে ইরান ফুটবল দলকে সর্বোচ্চ স্তরের বিশেষ নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আনা-নেওয়া করা হচ্ছে। হোটেল থেকে শুরু করে অনুশীলন ভেন্যু পর্যন্ত পুরো যাতায়াত পথকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। মেক্সিকোর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে এই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করলেও এখন পর্যন্ত নিহত ব্যক্তির সঠিক পরিচয় কিংবা এই ঘটনার পেছনে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধী চক্রের জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি। ফুটবল বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্ট সফল ও নিরাপদ করতে স্থানীয় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।