আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থায় পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে ইরানের উপকূলীয় পাঁচটি এলাকায় নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। সোমবার দেশটির পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ ইসলামি এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, পারমাণবিক শিল্পের একটি সমন্বিত কৌশলগত নথির আওতায় এই মেগা প্রকল্পগুলো হাতে নেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই তেহরানের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ খাতের এই বড় অবকাঠামোগত প্রসারের ঘোষণা এল।
মোহাম্মদ ইসলামি দেশটির সংসদের জ্বালানি ও নির্মাণবিষয়ক কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০২২ সালে অনুমোদিত পারমাণবিক শিল্পের সমন্বিত কৌশলগত নথির ওপর ভিত্তি করে এই নতুন প্রকল্পগুলোর নকশা ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়সূচি ও রূপরেখা অনুযায়ী উপকূলীয় অঞ্চলের পাঁচটি স্থানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রাথমিক কাজ ও নির্মাণ প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ইরানের জাতীয় গ্রিডে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পারমাণবিক বিদ্যুতের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা।
বর্তমানে পারমাণবিক জ্বালানি থেকে ইরান কী পরিমাণ সুবিধা পাচ্ছে, তার একটি খতিয়ানও এই বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান জানান, দেশটির দক্ষিণ উপসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত একমাত্র কার্যকর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘বুশেহর’ সম্প্রতি ৮০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় মাইলফলক অতিক্রম করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই বিশাল পরিমাণের ফলে ইরানের অভ্যন্তরে প্রায় ১৩১ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল অথবা ২১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাসের সমপরিমাণ খনিজ জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমেছে, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক সাশ্রয় নিশ্চিত হয়েছে।
এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিধি আরও বাড়ানো হচ্ছে বলে জানানো হয়। বর্তমানে প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে এই কেন্দ্রের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজ পুরোদমে চলছে। ইরানি প্রশাসনের মতে, এই সম্প্রসারণ প্রকল্পগুলো বর্তমানে দেশটির অন্যতম বৃহত্তম এবং সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল অবকাঠামোগত উন্নয়ন উদ্যোগ। এই প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হলে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণে পারমাণবিক শক্তি সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে এই নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া আঞ্চলিক সংঘাত, বিমান হামলা ও পাল্টা হামলার জেরে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতের সময়ে ইরানের একমাত্র সচল বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি একাধিকবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। তবে তেহরানের দাবি, এসব হামলার চেষ্টা সত্ত্বেও কেন্দ্রটির মূল অবকাঠামো, স্বাভাবিক কার্যক্রম বা জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া কোনোভাবেই ব্যাহত হয়নি।
এদিকে, লেবানন ও ইসরায়েল সীমান্তে চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সম্প্রতি বৈরুতে বিমান হামলা এবং এর জবাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর আঞ্চলিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। তবে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ভোরে ইরানের সামরিক বাহিনী সাময়িকভাবে হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। অপরদিকে ইসরায়েলি সূত্রগুলোও ইরানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা বন্ধের বিষয়ে সম্মতি জ্ঞাপন করেছে। তবে এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্ত ইরানের দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক বিদ্যুৎ পরিকল্পনায় কোনো প্রভাব ফেলবে না বলেই ইঙ্গিত দিচ্ছে দেশটির শীর্ষ মহল। বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক চাপের মুখেও ইরান যেভাবে পারমাণবিক শক্তিকে বেসামরিক জ্বালানি খাতে রূপান্তর করছে, তা দেশটির ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।