জাতীয় ডেস্ক
দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় পুশ-ইনের (অনুপ্রবেশ) ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উদ্বেগ ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নেত্রকোনার সীমান্ত এলাকাগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্ত এলাকায় বিজিবির সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা টহল জোরদার করা হয়েছে। বিজিবির এই বিশেষ টহল ও নজরদারি কার্যক্রমে স্থানীয় গ্রামবাসীরাও সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে পুশ-ইনের ঘটনা সামনে আসার পর নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান ও কৌশলগত কারণে এই অঞ্চলের সীমান্তকে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের অন্ধকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তজুড়ে সতর্কতার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে চোরাকারবারি বা অনুপ্রবেশকারীরা কোনো সুযোগ নিতে না পারে।
বর্তমানে সীমান্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পুশ-ইন প্রতিরোধকে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছে বিজিবি। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেবল সামরিক প্রস্তুতিই নয়, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় সীমান্তসংলগ্ন গ্রামের বাসিন্দারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। অনেক এলাকায় পুশ-ইন ও অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে এবং জনসচেতনতা বাড়াতে মসজিদের মাইক ব্যবহার করে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে এই বিশেষ নজরদারির আওতায় সীমান্তকেন্দ্রিক মানবপাচার এবং সব ধরনের মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধেও বাড়তি কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
বিজিবির নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নের তথ্য অনুযায়ী, বিগত এক বছরে এই অঞ্চলের বিজয়পুর সীমান্ত দিয়ে তিন দফায় নারী, শিশু, তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য এবং রোহিঙ্গা নাগরিকসহ মোট ৭৬ জনকে ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পুশ-ইন পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেওয়ায় নেত্রকোনা ব্যাটালিয়ন (৩১ বিজিবি) তাদের অধীনস্থ পুরো সীমান্ত এলাকায় কড়া নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু করেছে।
স্থানীয় সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক অনুপ্রবেশের ঘটনাগুলো তাদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। নিজেদের এলাকা নিরাপদ রাখতে এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিজিবির পাশে দাঁড়িয়েছেন। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এখন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দিকে কড়া নজর রাখছেন। অপরিচিত বা সন্দেহভাজন কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি দেখলেই তাৎক্ষণিকভাবে তা বিজিবিকে অবহিত করা হচ্ছে।
বিজয়পুর সীমান্তের বিজিবি ক্যাম্পের সুবেদার মো. নুরুল ইসলাম সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে জানান, সীমান্তে জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি টহল কার্যক্রম বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে। এই সীমান্ত রক্ষা কার্যক্রমে স্থানীয় গ্রামবাসীদের আন্তরিক সহযোগিতা বিজিবির মনোবল ও কার্যকারিতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নের (৩১ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৌহিদুল বারী সীমান্তের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি ব্যাখ্যা করে বলেন, নেত্রকোনার ৯২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এলাকায় ১০টি বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি), ময়মনসিংহের তিনটি এবং সুনামগঞ্জের দুটি বিওপিসহ মোট ১৫টি বিওপির আওতায় টহল ও কৌশলগত অবস্থান জোরদার করা হয়েছে।
অধিনায়ক আরও নিশ্চিত করেন যে, সীমান্তে বাড়তি সতর্কতা বজায় রাখার ফলে এখন পর্যন্ত কোনো পুশ-ইনের চেষ্টা সফল হতে দেওয়া হয়নি। অনুপ্রবেশের পাশাপাশি সব ধরনের সীমান্ত অপরাধ ও চোরাচালান শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় জনসাধারণের সচেতনতা ও বিজিবিকে নিয়মিত তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার এই যৌথ প্রয়াস সীমান্ত সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ বলয় তৈরি করেছে।