আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের বৈরী দুই দেশ ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে নতুন করে সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হয়েছে। লেবানন পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার জেরে উভয় দেশ একে অপরের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, ইরান থেকে ছিটকে আসা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় শনাক্ত করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে দেশের সর্বাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাবে ইরানের পক্ষ থেকেও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার দাবি করা হয়েছে। দুই দেশের এই আকস্মিক পাল্টাপাল্টি হামলায় অবরুদ্ধ অঞ্চলটিতে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা নতুন করে দেখা দিয়েছে।
ইসরায়েলের সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইরান থেকে ছিটকে আসা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মূলত ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামো লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল। আইডিএফের দাবি, তাদের শক্তিশালী ‘অ্যারো’ এবং ‘ডেভিডস স্লিং’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মাঝআকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই হামলার কারণে পুরো ইসরায়েল জুড়ে সতর্কতা সাইরেন বাজানো হয় এবং সাধারণ জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়। ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের সুরক্ষায় যেকোনো ধরনের হুমকি মোকাবিলায় তাদের বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে এবং এই উস্কানির উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
এই হামলার সূত্রপাত ঘটে মূলত লেবানন সীমান্তে চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্যমতে, লেবাননে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান ও আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় ইরান এই পদক্ষেপ নেয়। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইসরায়েল ক্রমাগত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে এবং লেবাননে তাদের ভাষায় ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেছে। এর ফলেই এই সতর্কতামূলক সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। আইআরজিসি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ইসরায়েল যদি তাদের এই আগ্রাসন ও সামরিক তৎপরতা বন্ধ না করে, তবে আগামীতে ইসরায়েল এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের আরও বড় ধরনের এবং বিধ্বংসী হামলার মুখোমুখি হতে হবে।
ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরপরই ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে পাল্টা বড় ধরনের বিমান হামলা চালায়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের কেন্দ্রীয় ও পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোকে লক্ষ্য করে ইসরায়েল দূরপাল্লার এয়ার-লঞ্চড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইসফাহান এবং তাবরিজ শহরের সামরিক ঘাঁটি ও পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকাগুলোতে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের পরপরই ওইসব অঞ্চলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং তীব্র গোলারোদের আলো দেখা যায়। তবে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েলের অধিকাংশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছে এবং বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও ইসরায়েলের এই সরাসরি সংঘাত শুধু এই দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে। লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতা এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের স্থল ও আকাশ যুদ্ধ ইতিমধ্যেই এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে জটিল করে তুলেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষায় সমর্থন দিলেও সংঘাত যেন আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো এই যুদ্ধাবস্থা নিরসনে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করার তাগিদ দিচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো ইরান ও ইসরায়েলের আকাশসীমা এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তেহরানের ইমাম খোমেনী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি অবিলম্বে একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি বা কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তবে এই ছায়াযুদ্ধ একটি স্থায়ী ও বিধ্বংসী আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। উভয় দেশের সামরিক বাহিনীই বর্তমানে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে এবং যেকোনো মুহূর্তেই আরও বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে।