আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিরসনে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সরাসরি সংলাপের একটি নতুন কূটনৈতিক প্রস্তাব সামনে এসেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে সরাসরি আলোচনার এই উদ্যোগকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানিয়েছে ইউরোপের তিন শীর্ষ পরাশক্তি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি। গতকাল রবিবার লন্ডনে আয়োজিত এক বিশেষ উচ্চপর্যায়ের প্রতিরক্ষা বৈঠক শেষে দেশ তিনটির রাষ্ট্রপ্রধানরা এই সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন। তবে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের এই আলোচনার প্রস্তাব এবং পশ্চিমাদের সমর্থনকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে রাশিয়ার প্রশাসনিক সদরদপ্তর ক্রেমলিন।
লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের সঙ্গে সার্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। বৈঠক শেষে তিন দেশের বিশ্বনেতাদের পক্ষ থেকে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, কার্যকর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এবং টেকসই শান্তি আলোচনার পথ সুগম করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সক্রিয় মধ্যস্থতায় ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে সরাসরি শীর্ষ বৈঠক আয়োজন করা আবশ্যক।
যৌথ বিবৃতিতে টেকসই শান্তির লক্ষ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন রূপরেখাও তুলে ধরা হয়। তিন দেশের নেতারা প্রস্তাব করেন, শান্তি আলোচনার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে যুদ্ধের ‘বর্তমান যোগাযোগ রেখা’ বা বর্তমান সামরিক নিয়ন্ত্রণ রেখাকেই আলোচনার ভিত্তি ধরা উচিত। তবে একই সঙ্গে তারা জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে কোনো দেশের ভৌগোলিক সীমান্ত জোরপূর্বক পরিবর্তন করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার ক্রেমলিনে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি বৈঠকে বসার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছিলেন ভলোদিমির জেলেনস্কি। কিন্তু রুশ প্রেসিডেন্ট সেই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে জানান, একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ও শর্তাবলি প্রথমে চূড়ান্ত করতে হবে। অগ্রিম কোনো রূপরেখা নির্ধারণ না করে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এই মুহূর্তে সরাসরি দেখা করার কোনো যৌক্তিকতা দেখছে না মস্কো।
ক্রেমলিনের এই অনমনীয় অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখতে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। পুতিনের কাছে নিজের কঠোর বার্তা পৌঁছে দিতে তিনি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রুশ ধনকুবের রোমান আব্রামোভিচের সহায়তা নিয়েছেন। কিয়েভে অবস্থানরত রোমান আব্রামোভিচের সঙ্গে সম্প্রতি একটি গোপন বৈঠক সম্পন্ন করার কথা নিশ্চিত করেছেন জেলেনস্কি। উল্লেখ্য, ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর ক্রেমলিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন এই রুশ ব্যবসায়ী।
আব্রামোভিচের মাধ্যমে ক্রেমলিনে পাঠানো বার্তায় ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করেছেন যে, ইউক্রেনের ভূখণ্ড রক্ষা করতে তারা বদ্ধপরিকর এবং কোনো অবস্থাতেই রাশিয়ার বিজয় মেনে নেওয়া হবে না। তবে সংঘাতের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে তিনি পুতিনের সঙ্গে মুখোমুখি সাক্ষাতের অনুরোধটি আবারও পুনর্ব্যক্ত করেন।
বর্তমানে ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে, যার ফলে দেশটির জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নিজস্ব আকাশসীমা সুরক্ষায় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য পশ্চিমা মিত্রদের কাছে জরুরি ভিত্তিতে আরও আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদ সরবরাহের অনুরোধ জানিয়ে আসছে কিয়েভ। সামরিক প্রতিরোধের পাশাপাশি যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির জন্য মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন জেলেনস্কি, যার সর্বশেষ বহিঃপ্রকাশ ঘটল লন্ডনের এই শীর্ষ বৈঠকে।