আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। লেবাননে ইসরায়েলের ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের জেরে দীর্ঘদিনের বিরতি ভেঙে ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এর জবাবে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। রবি ও সোমবারের এই পাল্টাপাল্টি হামলার পর ইয়েমেন থেকেও ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মধ্য ইসরায়েলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে সাময়িকভাবে আকাশসীমা বন্ধ করে দেয় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।
এর আগে গত এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়েছিল। এরপর থেকে তেহরান ইসরায়েলি ভূখণ্ডে সরাসরি কোনো আক্রমণ চালানো থেকে বিরত ছিল। তবে সম্প্রতি লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) তীব্র সামরিক তৎপরতা শুরু হলে ইরান তার অবস্থান পরিবর্তন করে। স্থানীয় সময় রবিবার দিবাগত রাতে ইসরায়েলের একটি কৌশলগত বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরানি বাহিনী।
ইরানের এই আক্রমণের পরপরই পাল্টা ব্যবস্থা নেয় তেল আবিব। ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ইরানের রাজধানী তেহরান, তাবরিজ এবং পারমাণবিক ও সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ শহর ইসফাহানকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। এসব শহরের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (এয়ার-লঞ্চড ব্যালিস্টিক মিসাইল) ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়। ইসরায়েলি এই অভিযানের কিছুক্ষণ পর ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিরাও ইসরায়েলের অভ্যন্তরে মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। আইডিএফ জানিয়েছে, ইয়েমেন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে মধ্য ইসরায়েলের বিশাল এলাকাজুড়ে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে এবং নাগরিক সুরক্ষার স্বার্থে আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এই সামরিক সংঘাতের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের হামলার পর ইসরায়েলকে পাল্টা আক্রমণ না চালানোর জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছিলেন। তেহরানের সঙ্গে স্থায়ীভাবে সংঘাতের অবসান ঘটানোর ক্ষেত্রে কূটনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে দাবি করে ট্রাম্প সতর্ক করেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যদি পাল্টা আঘাতের পথ বেছে নেন, তবে এই অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে চলা সংঘাতের কোনো অবসান ঘটবে না। তিনি আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধানের ওপর জোর দেন।
তবে ওয়াশিংটনের এই আহ্বান উপেক্ষা করেই ইসরায়েল তাদের সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। ইসরায়েলি প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপের সপক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইতার একটি বিবৃতিতে জানান, ইরান সরাসরি ইসরায়েলের ওপর ১১টি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যা ব্যাপক প্রাণহানি ঘটাতে পারত। যেকোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মতো ইসরায়েলও তার আত্মরক্ষার অধিকার থেকে এই জবাব দিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি এই আকাশযুদ্ধ এবং ইয়েমেনের সম্পৃক্ততা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মূল উদ্বেগ হলো, এই সংঘাতের পরিধি কতদূর গড়ায় এবং জ্বালানি তেলের বাজারসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর কী ধরনের প্রভাব পড়ে।