আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও দ্বীপের উপকূলীয় এলাকায় রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। আজ সোমবার (৮ জুন) স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে এই তীব্র কম্পন অনুভূত হয়। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ ও আতঙ্কের ফলে দেড় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। শক্তিশালী এই কম্পনের পর ফিলিপাইনসহ পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়, যা উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
ফিলিপাইনের ভূকম্পন ও আগ্নেয়গিরি বিষয়ক সংস্থা এবং মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল মিন্দানাওয়ের সারাঙ্গানি প্রদেশ থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রগর্ভে। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল প্রায় ৫৫ কিলোমিটার। ভূমিকম্পের মূল উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত জেনারেল সান্তোস সিটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৭ লাখ মানুষের বসতিপূর্ণ এই বাণিজ্যিক শহরটিতে একাধিক বহুতল ভবন, বিপণিবিতান এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। এছাড়া ভূমিকম্পের তীব্রতায় শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে, যার ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভূমিকম্পের সময় জেনারেল সান্তোস সিটির সেন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল এবং নটর ডেম অব ডাদিয়াঙ্গাস বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভবনের ছাদ ধসে পড়ে এবং জানালার কাচ ভেঙে যায়। হাসপাতাল ভবনের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় চিকিৎসাধীন রোগী এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ফিলিপাইনের একটি জনপ্রিয় ফাস্ট ফুড চেইনের তিনতলা বিশিষ্ট একটি শাখা ভবন সম্পূর্ণ ধসে রাস্তার ওপর পড়ে গেছে। ঘটনার সময় শহরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সকালের সমাবেশ চলছিলো, যেখানে তীব্র কম্পনে আতঙ্কিত হয়ে হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয় এবং অনেকেই ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
ভূমিকম্পের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র দেশের সকল সরকারি সংস্থাকে দ্রুত উদ্ধারকাজে নামার নির্দেশ দিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান সমন্বয়ের জন্য জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তর একযোগে কাজ শুরু করেছে। একই সাথে দুর্গত অঞ্চলের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফিলিপাইন রেড ক্রসের উদ্ধারকারী দল ইতোমধ্যে জেনারেল সান্তোস সিটিসহ অন্যান্য উপদ্রুত এলাকায় উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
ভূমিকম্পের পরপরই ফিলিপাইনের সারাঙ্গানি, দাভাও অক্সিডেন্টালসহ নয়টি প্রদেশে সমুদ্রের পানি এক মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় বাসিন্দাদের অবিলম্বে নিরাপদ ও উচ্চ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ফিলিপাইনের পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং জাপানের উপকূলীয় অঞ্চলেও সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় সুনামি সতর্কতা কেন্দ্র জানায় যে সুনামির বড় ধরনের ঝুঁকি কেটে গেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়া ‘প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার’ বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অগ্নিবলয়ে অবস্থিত হওয়ায় এই অঞ্চলে প্রায়শই শক্তিশালী ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির উদগিরণ ঘটে থাকে। আজকের এই দুর্যোগটিকে ১৯৯০ সালের পর ওই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে অভিহিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন হওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এবং চূড়ান্ত হতাহতের সংখ্যা জানা সম্ভব হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।