আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান ও ইসরায়েল ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হলেও তা উপেক্ষা করে পশ্চিম ও মধ্য ইরানের একাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন নিশ্চিত করেছে, এই হামলার পর রাজধানী তেহরান, তাবরিজ ও ইসফাহান শহরের আকাশসীমায় একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তেহরানের ইমাম খোমেনী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের প্রধান বিমানবন্দরগুলোর আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান কর্তৃপক্ষ।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার ফলে গত এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় অর্জিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। এর আগে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলিতে ইসরায়েলি বিমান হামলার জবাবে রবিবার রাতে ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে প্রায় ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানায়, উত্তর ইসরায়েলের রামাত ডেভিড বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছিল, যেখান থেকে লেবাননে হামলা পরিচালনাকারী ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো উড্ডয়ন করেছিল। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে, তারা আগত সবকটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে।
ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ফোন করে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার এবং ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক উদ্যোগের সুযোগ দেওয়ার জন্য জোরালো আহ্বান জানান। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প উল্লেখ করেন, বৈরুতে ইসরায়েলি হামলা এবং পরবর্তীতে ইসরায়েলের দিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ—কোনোটিই চলমান শান্তি আলোচনাকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে না। তবে মার্কিন প্রশাসনের এই কূটনৈতিক অনুরোধ ও চাপ উপেক্ষা করেই ইসরায়েল কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইরানি ভূখণ্ডে এই বিমান হামলা চালায়।
আইডিএফের একজন মুখপাত্র সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ইরানের সামরিক অবকাঠামো এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে এই সুনির্দিষ্ট হামলা চালানো হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানি প্রশাসন পুনরায় সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়ে মারাত্মক ভুল করেছে এবং এর পরিণতি তাদের ভোগ করতে হবে। অন্যদিকে, ইরানের সামরিক বাহিনীর খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দফতর থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের এই আগ্রাসন বরদাশত করা হবে না। যদি ইসরায়েলি বাহিনী তাদের হামলা আরও বিস্তৃত করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ও ইসরায়েলি সবকটি সামরিক ঘাঁটি ও সম্পদকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য করে এর চেয়েও কঠোর ও বিধ্বংসী জবাব দেওয়া হবে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ বাহিনীর মধ্যে শুরু হওয়া এই সংঘাতের পর থেকে এ পর্যন্ত উভয় পক্ষে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগে প্রায় ৪০ দিনের টানা সংঘর্ষে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বসহ হাজার হাজার সামরিক ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলে ২ ডলারের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। কূটনীতিকরা আশঙ্কা করছেন, দুই দেশের এই অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে এক অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।