আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক ও কূটনৈতিক সংঘাতের অবসান ঘটাতে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি বা সমঝোতা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলোচনার প্রচেষ্টা চালানো হলেও ইরানি নেতৃত্বের অনড় অবস্থান এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে এই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যে গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূরাজনৈতিক সংকট নিয়ে ওয়াশিংটনের বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব দীর্ঘ সময় ধরে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের রাজনীতি পরিচালনা করে আসছে। ফলে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে তারা সহজে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে কিংবা ছাড় দিতে রাজি হচ্ছে না। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আশা প্রকাশ করেন যে, পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে শেষ পর্যন্ত ইরানকে একটি স্থায়ী সমঝোতায় আসতে হবে।
হোয়াইট হাউজের এই শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংঘাত টানা চতুর্থ মাসে পদার্পণ করেছে। এর আগে গত এপ্রিল মাসে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় সেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। উল্টো সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী এবং এর আশেপাশের সামুদ্রিক এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা ও ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনা ঘটেছে। এই অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংঘাতের দ্রুত অবসান বা কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়া নিয়ে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে সমালোচনা চলছে, তারও জবাব দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কয়েক দশকের ভূরাজনৈতিক বৈরিতা এবং আদর্শিক বিরোধ রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। একটি টেকসই এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজনীয় সময় ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনার মধ্য দিয়েই এগোতে হবে।
সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট চলমান সংঘাতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা হ্রাসের বিষয়ে নিজস্ব মূল্যায়ন তুলে ধরেন। তার দাবি অনুযায়ী, সংঘাতের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন সামরিক বাহিনী ও তাদের মিত্রদের সুনির্দিষ্ট বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের সামরিক অবকাঠামোর একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে দেশটির ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র, স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত সামরিক স্থাপনাগুলোর সিংহভাগ ধ্বংস বা অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি বাস্তবমুখী সতর্কতা ব্যক্ত করে বলেন, এই ক্ষয়ক্ষতির পরও ইরানের অস্ত্রাগারে এখনো কিছু দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং অত্যাধুনিক ড্রোন রয়ে গেছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ।
এর আগে অপর এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, তেহরানের ওপর আরোপিত কঠোর মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা হয়তো অনির্দিষ্টকালের জন্য বহাল রাখা হবে না। তবে বর্তমান স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে ওয়াশিংটনকে দ্রুতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে তিনি মনে করেন। মার্কিন প্রশাসনের সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে—হয় কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো, অন্যথায় বিকল্প কঠোর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এই বিকল্প ব্যবস্থাটি সামরিক বা কঠোরতর কূটনৈতিক চাপ হতে পারে উল্লেখ করে ট্রাম্প সতর্ক করেন যে, সেই পথটি ইরানের জন্য মোটেও সুখকর হবে না। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য ইরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে আলোচনার টেবিলে বাড়তি সুবিধা আদায়ের একটি কৌশল হতে পারে।