আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি যাচাই বা পরিদর্শনের সুযোগ না থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)। সংস্থাটি জানিয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিদর্শনের সুযোগ না পাওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ৪ জুন আইএইএ-র একটি গোপনীয় প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনে বিশ্ব নিরাপত্তার স্বার্থে ইরানকে অবিলম্বে পরমাণু কেন্দ্রগুলো পরীক্ষার অনুমতি দিতে এবং আইএইএ-র সাথে ইতিবাচকভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
২০২৫ সালের জুন মাসে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক সামরিক হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিশেষ করে গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ১২ দিনব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সময় ইরানের বেশ কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালানো হয়। এই সামরিক হামলার পর থেকেই তেহরান আইএইএ-র পরিদর্শকদের তাদের গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু কেন্দ্রগুলোতে প্রবেশাধিকার দেওয়া বন্ধ করে দেয়, যা বর্তমান অচলাবস্থার মূল কারণ।
আইএইএ তাদের প্রতিবেদনে স্বীকার করেছে যে, সাম্প্রতিক সামরিক হামলার কারণে সেখানে একটি নজিরবিহীন ও জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পরমাণু কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা ও ইউরেনিয়ামের স্থিতি পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। গত বছরের জুনে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার আগে আইএইএ-র হিসাব অনুযায়ী, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম মজুদ ছিল। সাধারণত পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন হয়। ফলে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল, যা ২০১৫ সালের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তির নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। হামলায় বিধ্বস্ত কেন্দ্রগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকরা ঢুকতে না পারায় গত এক বছর ধরে এই বিশাল ইউরেনিয়াম মজুদের বর্তমান অবস্থা ও অবস্থান কী, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দীর্ঘ দিন ধরেই দাবি করে আসছে যে, ইরান বেসামরিক কর্মসূচির আড়ালে গোপনে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ইরানকে অবশ্যই পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথ ত্যাগ করতে হবে এবং তাদের বর্তমান ইউরেনিয়াম মজুদ সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে হবে। অন্যথায় এই অঞ্চলে টেকসই স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, পরমাণু অস্ত্র তৈরির এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে তেহরান। ইরানের ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের এই পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বেসামরিক, চিকিৎসানির্ভর এবং শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা বা উদ্দেশ্য তাদের নেই। তবে পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার না দেওয়ায় ইরানের এই দাবি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইএইএ ও ইরানের এই মুখোমুখি অবস্থান যদি দ্রুত নিরসন না হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।