আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি চলমান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন। পুতিনের উদ্দেশে লেখা এক দীর্ঘ খোলা চিঠিতে তিনি এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। জেলেনস্কি উল্লেখ করেছেন, ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই কেবল দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তবে ক্রেমলিন তাৎক্ষণিকভাবে এই প্রস্তাবের শর্ত ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে রাশিয়ার পূর্ববর্তী অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং সরাসরি এমন প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে।
প্রস্তাবিত খোলা চিঠিতে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট আলোচনার পুরো সময়জুড়ে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকরের আহ্বান জানান। একই সাথে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট টেনে তিনি উল্লেখ করেন, ইউরোপের এই যুদ্ধ পরিস্থিতি আবারও যুক্তরাষ্ট্রের মূল মনোযোগে ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা কিয়েভের জন্য সমীচীন হবে না। জেলেনস্কির মতে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে অন্যান্য আঞ্চলিক সংকটগুলো স্থান পাচ্ছে, যার ফলে ইউরোপীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই সম্ভাব্য বৈঠককে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, দুই দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যে এ ধরনের সরাসরি সংলাপ হলে তা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
ক্রেমলিন সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের প্রেরিত চিঠিটি মস্কোয় পৌঁছেছে এবং বিষয়বস্তু সম্পর্কে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে অবহিত করা হয়েছে। তবে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় নীতি ও পূর্বঘোষিত শর্তের বাইরে গিয়ে এই মুহূর্তে কোনো বিশেষ আলোচনায় বসার সম্ভাবনা নাকচ করেছে ক্রেমলিন। মস্কোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আলোচনার জন্য ইউক্রেনীয় পক্ষকে রাশিয়ার নির্ধারিত শর্তাবলি মেনেই অগ্রসর হতে হবে। এর আগেও ক্রেমলিন জানিয়েছিল, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট চাইলে মস্কোতে এসে পুতিনের সঙ্গে দেখা করতে পারেন, তবে তা ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব বা ভূখণ্ডগত দাবির ভিত্তিতে নয়, বরং রাশিয়ার নিরাপত্তা স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে হতে হবে।
অন্যদিকে সেন্ট পিটার্সবার্গে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিদেশি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানান, রাশিয়া ইউক্রেন সংকটের একটি স্থায়ী ও পারস্পরিক সমঝোতামূলক সমাধানে পৌঁছাতে নীতিগতভাবে প্রস্তুত। তবে এর জন্য উভয়পক্ষকেই বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর পথ খুঁজতে হবে। পুতিন তাঁর দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ইউক্রেনকে অবশ্যই রাশিয়ার আংশিক নিয়ন্ত্রণে থাকা দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চল থেকে নিজেদের সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। এর পাশাপাশি কিয়েভকে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটো সামরিক জোটে যোগদানের সমস্ত প্রক্রিয়া ও প্রচেষ্টা স্থায়ীভাবে ত্যাগ করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে হবে।
ইউক্রেন সরকার রাশিয়ার এই শর্তসমূহকে শুরু থেকেই সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। কিয়েভের নীতিগত অবস্থান হলো, কোনো অবস্থাতেই নিজেদের সার্বভৌম ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে না। ইউক্রেনীয় প্রশাসনের আশঙ্কা, এখন কোনো ভূখণ্ডগত ছাড় দিলে তা ভবিষ্যতে রাশিয়ার পক্ষ থেকে আরও বড় ধরনের সামরিক আগ্রাসনের পথ উন্মুক্ত করে দেবে। কিয়েভের নীতিনির্ধারকরা এই প্রসঙ্গে ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া অধিগ্রহণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দেন। তারা উল্লেখ করেন, সে সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শিথিলতা এবং ভূখণ্ডগত সমঝোতার চড়া মূল্য হিসেবে ২০২২ সালে ইউক্রেনকে পূর্ণমাত্রার রুশ সামরিক অভিযানের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত আলোচনা পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। এর আগে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি এবং তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক শান্তি আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হলেও দৃশ্যমান বা উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। মাঠপর্যায়ে যুদ্ধ অব্যাহত থাকায় এবং উভয় পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থানের চরম ভিন্নতার কারণে একটি টেকসই কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানো আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের জন্যও দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে।