আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টিটিভস) প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কংগ্রেসের পূর্বানুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা সীমিত করার লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। স্থানীয় সময় বুধবার ওয়াশিংটনে ডেমোক্র্যাট সদস্যদের উত্থাপিত এই ‘ওয়ার পাওয়ারস’ প্রস্তাবটি ২১৫-২০৮ ভোটের ব্যবধানে গৃহীত হয়। ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলের চারজন সদস্য দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে ডেমোক্র্যাটদের আনা এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও এই প্রস্তাব পাস হওয়াকে দেশটির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখছেন।
গৃহীত প্রস্তাবটিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, আইনসভার সুস্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যেকোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বা যুদ্ধাবস্থা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, কোনো দেশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করার একক এবং চূড়ান্ত ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসেরই রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আইনপ্রণেতাদের পাশ কাটিয়ে প্রেসিডেন্টের সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আইনসভার ভেতরে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে রিপাবলিকান প্রশাসনের বারবার সামরিক শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত কংগ্রেসের উভয় পক্ষের বেশ কিছু আইনপ্রণেতাকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করে তোলে, যার প্রতিফলন ঘটেছে এই ভোটাভুটিতে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাবটি পাস হলেও এটি চূড়ান্তভাবে আইনে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা বেশ জটিল এবং সীমিত। যুক্তরাষ্ট্রের আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী, কোনো বিল বা প্রস্তাব কার্যকর করতে হলে তা কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ তথা সিনেটেও সমভাবে পাস হতে হয়। সিনেটেও রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এছাড়া প্রস্তাবটি আইনসভায় পাস হওয়ার পর হোয়াইট হাউসে গেলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করে এতে ভেটো বা নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন। প্রেসিডেন্টের সেই সম্ভাব্য ভেটো বা আইনি বাধা অতিক্রম করে প্রস্তাবটিকে আইনে রূপ দিতে হলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ব্যাপক সমর্থনের প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ডেমোক্র্যাটদের জন্য অত্যন্ত দূরূহ।
এর আগেও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সংকুচিত করতে প্রতিনিধি পরিষদে তিনবার একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পূর্ববর্তী তিনটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও প্রতিবারই পক্ষে ও বিপক্ষের ভোটের ব্যবধান উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসছিল। বুধবারের এই ভোটটি ছিল চলতি বছরের মধ্যে চতুর্থ প্রচেষ্টা এবং এটি পাসের মাধ্যমে আইনপ্রণেতারা ট্রাম্পকে কংগ্রেসের প্রতি দায়বদ্ধ করতে একটি শক্তিশালী বার্তা পাঠাতে সক্ষম হয়েছেন। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে এই যুদ্ধ পরিস্থিতিকে একটি ‘স্বল্পমেয়াদি সামরিক অভিযান’ বা ‘ছোটখাটো সংঘর্ষ’ হিসেবে বর্ণনা করার চেষ্টা করা হলেও কংগ্রেসের সিংহভাগ সদস্য একে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পরিস্থিতি হিসেবেই বিবেচনা করছেন।
মূলত গত মে মাসের শেষভাগেই এই ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্টের ওপর চূড়ান্ত ভোট অনুষ্ঠানের কথা ছিল। কংগ্রেসের মেমোরিয়াল ডে অবকাশ শুরু হওয়ার আগের দিন, অর্থাৎ ২১ মে এই ভোটাভুটির সূচি নির্ধারিত ছিল। সে সময় ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্যও বিলটির পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন—এমন সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। তবে তৎকালীন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও হাউস স্পিকার মাইক জনসন নির্ধারিত সময়ের আগেই আইনসভার অধিবেশন মুলতবি করার আকস্মিক সিদ্ধান্ত নেন, যার ফলে শেষ মুহূর্তে ভোটটি বাতিল হয়ে যায়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও মার্কিন যৌথ বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে একযোগে সামরিক অভিযান শুরু করে। আগামী শনিবার এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ১০০ দিন পূর্ণ হতে যাচ্ছে। যদিও দীর্ঘ সংঘাতের পর গত ৮ এপ্রিল থেকে উভয় পক্ষের সম্মতিতে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, তবুও মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত নাজুক। এই যুদ্ধবিরতি চলার মাঝেই মধ্যবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান উভয় পক্ষই একে অপরের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে একাধিকবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের এই সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সামরিক কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।