আইন আদালত ডেস্ক
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন শিশুটির বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা এবং মা পারভীন আক্তার।
মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে তারা এই জবানবন্দি প্রদান করেন। শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের সহায়তায় ঘটনার দিন ঘটে যাওয়া নৃশংসতার বিবরণ আদালতে উপস্থাপন করেন নিহতের পিতা-মাতা।
মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তিনি কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে বনানীর কাকলীর অফিসের দিকে রওনা হন। অফিসে পৌঁছানোর পর তার স্ত্রী পারভীন আক্তার মুঠোফোনে জানান যে, তাদের ছোট মেয়ে রামিসাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সংবাদ পেয়ে তিনি দ্রুত মিরপুরের বাসায় ফিরে আসেন এবং ভবনের সামনে ও নিজ ফ্ল্যাটের সামনে প্রতিবেশীদের ভিড় দেখতে পান। সে সময় তার স্ত্রী জানান, রামিসা পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানা ও স্বপ্না দম্পতির বন্ধ ঘরে আটকে রয়েছে। ঘরের ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পাওয়ায় এবং দরজা ভেতর থেকে লক থাকায়, উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দা রাজুসহ অন্যান্যরা দরজা ভাঙার চেষ্টা করেন। পরে আব্দুল হান্নান মোল্লা নিজে একটি হাতুড়ি এনে দরজা ভাঙেন।
জবানবন্দিতে বাদী আরও জানান, দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশের পর তারা ওই ফ্ল্যাটের বাথরুমের সামনে রক্তের দাগ দেখতে পান। এ সময় অভিযুক্ত স্বপ্নাকে ঘরের ভেতরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। পরবর্তীতে উপস্থিত লোকজন আসামিদের শয়নকক্ষের ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে একটি স্টিলের খাট উঁচু করলে, নিচে থাকা বালতির ভেতর থেকে রামিসার বিচ্ছিন্ন মস্তক উদ্ধার করা হয়। এই দৃশ্য দেখার পর বাদী সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। ঘটনার পর তিনি বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এরপর মামলার দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে রামিসার মা পারভীন আক্তার আদালতে তার সাক্ষ্য প্রদান করেন। তিনি জানান, ঘটনার দিন সকালে তিনি রান্না করছিলেন। তার বড় মেয়ে রাইসা আক্তার মিরপুরে অবস্থানরত তার চাচার বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ছোট মেয়ে রামিসাও তার সঙ্গে যাওয়ার বায়না ধরে। বড় মেয়ে রাইসা একাই ঘর থেকে বের হয়ে যায় এবং রামিসা ঘরেই থেকে যায়। এর কিছুক্ষণ পর পাশের ফ্ল্যাট থেকে একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পান পারভীন আক্তার। তবে ভবনে অন্য শিশু থাকায় বিষয়টি প্রথমে গুরুত্ব দেননি। এর ৩-৪ মিনিট পর বড় মেয়ে একা বাসায় ফিরে এলে রামিসার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ পায়।
পারভীন আক্তার আরও জানান, চারদিকে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে ওই ভবনের তিন তলার ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রামিসার একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। সন্দেহ হওয়ায় তিনি ফ্ল্যাটের দরজা ধাক্কাধাক্কি করেন এবং ভেতরে থাকা স্বপ্নাকে বারবার দরজা খোলার অনুরোধ জানান। সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি ভবনটির অন্যান্য তলার বাসিন্দাদের এবং তার স্বামীকে বিষয়টি অবগত করেন। পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ঘরের লক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে বাথরুমের সামনে রক্ত এবং ঘরের ভেতর রামিসার খণ্ডিত মরদেহ দেখতে পাওয়া যায়। পরবর্তীতে পুলিশ এসে ঘটনাস্থল থেকে নিহতের পরনের পোশাকসহ অন্যান্য আলামত জব্দ করে।
এর আগে, গত ১ জুন (সোমবার) সংশ্লিষ্ট আদালত মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর আদেশ দেন। একই দিনে আদালত মামলার বাদীসহ রাষ্ট্রপক্ষের ১৮ জন সাক্ষীর বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। গত ২৪ মে ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে দাখিল করা পুলিশি অভিযোগপত্রটি আমলে নেয়। এর আগে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান চার্জশিট দাখিল করেছিলেন।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, নিহত রামিসা স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে ঘর থেকে বের হলে অভিযুক্ত স্বপ্না তাকে কৌশলে নিজেদের ফ্ল্যাটে ডেকে নেয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু হলে আসামির দরজার সামনে জুতা পাওয়া যায়। ঘটনার পর জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল দেওয়া হলে পল্লবী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্ত স্বপ্নাকে আটক করে। পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপর আসামি সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এই ঘটনায় ২০ মে পল্লবী থানায় মামলা দায়েরের পর দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ। মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।