অপরাধ ডেস্ক
রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বৈধ অগ্নি নিরাপত্তা লাইসেন্স নেই এবং কোনো ফায়ার সেফটি প্ল্যানও জমা দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স। গত সপ্তাহে প্রতিষ্ঠানটিতে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার পর এই অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৩ সালের পর থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের অগ্নি নিরাপত্তা লাইসেন্স নবায়ন করেনি এবং একাধিকবার নোটিশ দেওয়া সত্ত্বেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এই ঘটনাটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও তদারকির ঘাটতিকে পুনরায় আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, অগ্নি নিরাপত্তা পরিকল্পনা বা ফায়ার সেফটি প্ল্যান জমা না দেওয়ায় আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্পষ্টত প্রচলিত আইন ও বিধি লঙ্ঘন করেছে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টাফ অফিসার শাহজাহান সিকদার এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে বলেন, আদ-দ্বীন হাসপাতাল ২০২৩ সালের পর থেকে তাদের ফায়ার লাইসেন্স নবায়ন করেনি। প্রতিষ্ঠানের এই উদাসীনতার প্রেক্ষিতে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে একাধিকবার আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠানো হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে একটি চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। ওই নোটিশে আগামী তিন মাসের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ফায়ার সেফটি প্ল্যান জমা দিয়ে হাসপাতালের সার্বিক অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে গেলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেনি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, ফায়ার প্রিভেনশন অ্যান্ড এক্সটিংগুইশিং অ্যাক্ট, ২০০৩ এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী, যেকোনো বহুতল ভবন বা হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে অগ্নি নিরাপত্তা পরিকল্পনার অনুমোদন নেওয়া এবং তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা আইনত বাধ্যতামূলক। আদ-দ্বীন হাসপাতাল এই আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
অন্যদিকে, লাইসেন্স ও নিরাপত্তা ঘাটতির এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের হিউম্যান রিসোর্স ও কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল দাবি করেছেন, হাসপাতালের ফায়ার লাইসেন্সসহ সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক নথি হালনাগাদ রয়েছে। তিনি আরও জানান, সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক নির্দেশনার পর হাসপাতালের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে ইতিমধ্যেই জমা দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি এবং ফায়ার সার্ভিসের বিবৃতির মধ্যে এই বৈপরীত্যের কারণে বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
এর আগে গত বুধবার ভোরে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। নবজাতকদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে এবং হাসপাতালের চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিগুলোকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে, এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট রমনা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার সুনির্দিষ্ট তদন্ত প্রক্রিয়া পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে চলমান রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, রাজধানীর একটি অন্যতম প্রধান বেসরকারি হাসপাতালে অগ্নি নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে এমন ঘাটতি থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিদিন যেখানে হাজারো রোগী, নবজাতক এবং সাধারণ মানুষ সেবা নিতে আসেন, সেখানে ফায়ার লাইসেন্স না থাকা এবং সেফটি প্ল্যান বাস্তবায়ন না করা বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়মিত তদারকি করার জন্য সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।