আন্তর্জাতিক ডেস্ক
কানাডার তেলসমৃদ্ধ প্রদেশ আলবার্টাকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার রাজনৈতিক তৎপরতাকে যুক্তরাজ্যের ‘ব্রেক্সিট’-এর সঙ্গে তুলনা করে একে অত্যন্ত ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বিচ্ছিন্নতার পক্ষে ভোট দেওয়ার চূড়ান্ত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি কী হতে পারে, সে সম্পর্কে সাধারণ নাগরিকেরা হয়তো পুরোপুরি অবগত নন। ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ত্যাগের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সময় ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নরের দায়িত্বে থাকা কার্নি নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এই মন্তব্য করেন।
সম্প্রতি অটোয়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কানাডার প্রধানমন্ত্রী ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিচ্ছিন্নতার পক্ষে ভোট দেওয়ার আগে প্রচার করা হয়েছিল যে প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ হবে এবং বাকি বিষয়গুলো পরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যাবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্রেক্সিটের এক দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরও ব্রিটিশ জনগণ এমন এক জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য লড়াই করছে, যা তারা ভোট দেওয়ার সময় কল্পনাও করেনি। আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকেও তিনি একটি ‘বিপজ্জনক ফাঁকা আওয়াজ’ বা ব্লাফ হিসেবে অভিহিত করেন, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
কানাডার পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ আলবার্টা খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সাম্প্রতিক সময়ে ওটাওয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে প্রদেশটির নীতিগত দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার অতিরিক্ত পরিবেশগত বিধিনিষেধ ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আলবার্টার তেলশিল্পকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং এই খাতে নতুন বিনিয়োগের পথ রুদ্ধ করছে। এই ক্ষোভকে পুঁজি করে প্রদেশটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে। আন্দোলনকারীরা দাবি করেছে, কানাডা থেকে আলাদা হওয়ার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের লক্ষ্যে তারা ইতোমধ্যে তিন লাখেরও বেশি নাগরিকের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছে, যা স্থানীয় আইন অনুযায়ী গণভোটের দাবি উত্থাপনের জন্য যথেষ্ট।
তবে এই গণভোটের আইনি প্রক্রিয়াটি সম্প্রতি আদালতের রায়ে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। আলবার্টার একটি আদালত পুরো প্রক্রিয়াটির ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেছেন। বিচারক তাঁর রায়ে উল্লেখ করেন, বিচ্ছিন্নতার এই নাগরিক উদ্যোগ নেওয়ার আগে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা পরামর্শ করা হয়নি। প্রদেশটি যদি কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে সেখানে বসবাসকারী আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার ও সুরক্ষা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। আদিবাসীদের অধিকারকে উপেক্ষা করে নেওয়া এই উদ্যোগ আইনিভাবে বৈধ নয় বলে আদালত রায় দেন।
আদালতের এই সিদ্ধান্তকে ‘ভুল’ আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আলবার্টার রক্ষণশীল প্রিমিয়ার (প্রাদেশিক সরকারপ্রধান) ডেনিয়েল স্মিথ। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আইনি জটিলতা এড়াতে নতুনভাবে ব্যালট প্রশ্ন তৈরি করা হবে এবং গণভোটের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। এর আগে গত অক্টোবরে স্মিথ ঘোষণা করেছিলেন, স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে কিনা, তা তিনি আলবার্টার জনগণের ভোটের মাধ্যমে জানতে চান। যদিও রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে তিনি নিজেকে ব্যক্তিগতভাবে কানাডার অংশ থাকার পক্ষেই মত প্রকাশ করেছেন।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, আলবার্টার প্রায় ৫০ লাখ বাসিন্দার মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এখন পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন জানাচ্ছে। প্রদেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে বিচ্ছিন্নতাবাদের পক্ষে এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ জনসমর্থন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত এই গণভোটে যদি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পরাজিতও হয়, তবুও এই আন্দোলনের তীব্রতা ও পুরো রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটি কানাডার ফেডারেল কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে দীর্ঘ মেয়াদে চিরতরে বদলে দেবে।